
চারিদিকে বিশাল বিশাল হিমবাহ আর বরফ কেটে কেটে তার মাঝ দিয়ে বিশাল জাহাজ ছুটে চলছে। আলাস্কা নামটা শুনলে আমার মনে শুধু এই দৃশ্য ভেসে উঠে। যার কাছ থেকেই আলাস্কার কথা শুনি বেশীর ভাগই শুধু ক্রুজ শিপে করে আলাস্কা ঘুরতে যায়। কিন্তু আমার কাছে কেন জানি প্যাকেজ ট্রিপ ভাল লাগে না। আমার কথা যেখানে ভাল লাগবে ওখানে দরকার হলে একদিন বেশী থাকব আর ভাল না লাগলে আবার চলে যাব। আমি যদি আমার ইচ্ছা মত ঘুরতে না পারলাম, কোথাও গাড়ি থামিয়ে চুলা জ্বালিয়ে যদি চা না খেতে পারি, থাকার জায়গা না পেয়ে গাড়িতে যদি না ঘুমাতে পাড়ি আবার মাঝ রাতে যদি জন্গলে পথ না হারাই তাহলে ওই ট্যুরের মজা কোথায়। এই ভেবেই এডমন্টন (আলবার্টা)- এন্কোরেজ (আলাস্কা) রোড ট্রিপের পরিকল্পনা
আলাস্কা ঘুরার থেকে আলাস্কা যাবার পথটাতেই আমার আগ্রহ বেশী। দিনের পর দিন শুধু ম্যাপ নিয়ে রুট খুজেছি, টার্গেট ছিল একটাই- কতটা চ্যলেন্জিং পথ নেয়া যায়। আট হাজার কিমি এর ড্রাইভিং, চেষ্টা ছিল লুপ আকারে ঘুরার। কানাডার প্রভিন্স আলবার্টা থেকে শুরূ করে বৃটিশ কলম্বিয়া, ইউকুন টেরিটরি হয়ে আলাস্কা। দু তিনটা সম্ভাব্য রূট ঠিক করে নিলাম, বাকি হোটেল থেকে শুরূ করে ঘুরাঘুরির জায়গা কোন কিছুই আগে থেকে ঠিক করিনি। যেতে যেতে বাকি সব এক্সপ্লোর করে নিব। কেমন ছিল আলাস্কার এই বার দিনের গল্প. . .
টরন্টো থেকে চার ঘন্টা ফ্লাই করে আলবার্টার রাজধানী এডমন্টন। ভোর বেলার ফ্লাইট আবার এডমন্টনের সাথে দু ঘন্টা সময়ের ব্যবধানের কারনে সকালেই পৌছে গেলাম এডমন্টনে ফয়সাল ভাই এর বাসায়। ভাইয়া আগে থেকেই আমাদের জন্য রোড ট্রিপের জরূরি কিছু জিনিসপত্র (কুলার, ক্যাম্পিং স্টোভ, রান্নার পাতিল, কাথা বালিস) আর চার পাঁচ দিনের খাবার ফ্রোজেন করে রেডি করে রেখে দিয়েছিল। সকালের নাস্তা আর হালকা একটু বিশ্রাম নিয়ে দুপুর বারটার দিকে ফয়সাল ভাই এর লেক্সাস গাড়ী নিয়ে বের হয়ে গেলাম, গন্তব্য আটশত কিমি দূরে রকি মাউন্টেনের শহর প্রিন্স জর্জ।
এ বছর জেসপারে ভয়াবহ ফরেস্ট ফায়ারে এ রাস্তা অনেক দিন বন্ধ ছিল। ভয়ে ভয়ে গাড়ি চালাচ্ছি, কোথাও রাস্তা বন্ধ থাকলে আবার বিশাল রাস্তা ঘুরে যেতে হবে। ঘন্টা খানেক পরেই দূরে উঁচু উঁচু পর্বতগুলো দেখা যাচ্ছে আর আমার ভিতর অদ্ভুত এক আনন্দ অনুভূতি কাজ করতে লাগল।জেসপারে ঢুকেই মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল। চারপাশে সবকিছু পূড়ে ছাই। পাহাড়গুলো থেকে আগুনের ধোঁয়াএখনও বের হচ্ছে। সবুজ পর্বতগুলো সব কাল হয়ে গেছে তারপরও কি গর্ব নিয়ে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে। আগে যে রাস্তায় পাঁচ মিনিট পর পরই ছবি তোলার জন্য থামতাম সেখানে এখন থামা নিষেধ।
শুধু গাড়ি চালিয়ে চলে যেতে হবে কোথাও থামা যাবে না। যাই হোক জেসপার ক্রস করে কানাডিয়ান রকির সবচেয়ে উঁচু চূঁড়া মাউন্ট রবসন। প্রায় তের হাজার ফুট উঁচু এই পর্বতকে ঘিরেই প্রভিন্স্য়াল পার্ক। ভাগ্য ভাল থাকলে অনেক সময় নিচে থেকেই চূঁড়া দেখা যায়, কিন্তু বেশীরভাগ সময়েই মেঘে ঢাকা থাকে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ভিজিটর সেন্টার আর ছোট্ট একটা গিফ্ট সপ। পাশের গ্যাস স্টেশন থেকে গাড়ির ট্যাংক ফুল করে নিলাম, সন্ধ্যা ৬ টা বেজে গেছে, আমাদের আরও চার ঘন্টা যেতে হবে। পাহাড়ে সন্ধ্যার পর সব গ্যাস স্টেশনেই বন্ধ হয়ে যায়, তাই এ ব্যাপারে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়।
এখান থেকে মাত্র দশ মিনিটের ড্রাইভ রিয়ার গার্ড ফলস প্রভিন্সিয়াল পার্ক। অসাধারণ সুন্দর একটা ঝর্না। পাহাড় থেকে বেয়ে নামা শুভ্র সাদা পানি ফ্রেজার নদী হয়ে এখানে অনেক খানি নিচে নেমে গেছে। আর এ থেকেই এত সুন্দর ঝর্না । প্রশান্ত মহাসাগর থেকে প্রায় বার শত কিমি সাঁতরে স্যামন মাছগুলো ডিম পাড়ার জন্য এখানে চলে আসে। একটু ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করলে বিশাল বিশাল স্যামন এর জাম্পিং দেখা যায়। গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মধ্যে কিছুক্ষন হাঁটাহাঁটি করে গাড়িতে উঠার আগে ফ্রোজেন খাবারগুলো থেকে এক প্যাকেট গরম করে নিয়ে নিলাম।
যদিও রাত আটটা বেজে গেছে তারপরও যথেষ্ট পরিমান দিনের আলো আছে এখনও। চলতি পথে গাড়িতে বসেই ডিনার করে নিলাম। গরূর মাংস ছোট ছোট করে কেটে তেহারি রান্না করা। সাথে ছোট কচকচে পিয়াজ আর সবুজ কাচা মরিচ। অনেকদিন পর আবার সেই নীলক্ষেতের তেহারির কথা মনে পরে গেল। নিজের হাত দিয়ে খেতে পারলে সবচেয়ে মজা হত কিন্তু এখন গাড়ি চালাতে চালাতে সহযাত্রীর হাত থেকে খাবার সুযোগটাও মিস করতে চাচ্ছিলাম না।
রাত প্রায় একটার দিকে আমরা ট্রাভেললজ হোটেলে পৌছালাম। যেহেতু শুধু রাতটাই থাকব তাই আসার পথে কমপ্লিমেন্টারি সকালের নাস্তা সহ সস্তা দেখে এই হোটেলটা বুক করে নিয়েছিলাম। প্রিন্স জর্জ এখানকার অনেক পুরোনো এবং জনবসতি পূর্ন শহর। নর্থের রাস্তা গুলো সব এই শহরের উপর দিয়েই গেছে, অনেকটা জাংশন ধরনের। হোটেলটা ঠিকঠাক হলেও মেঝে-দেয়াল এগুলো দেখে বুঝা যায় যে অনেক পুরোনো। একটা পুরোনো গন্ধ আছে কিন্তু আমার কাছে এগুলো তেমন খারাপ লাগে না আর শুধু তো রাতটা ঘুমানো। একটা ভাল ঘুম খুব দরকার| কালকে আরও আটশত কিমি এর পথ . . .




