কুমিল্লা থেকে উইন্ডসর : পেছন ফিরে দেখা

কুমিল্লা থেকে উইন্ডসর পেছন ফিরে দেখা

আমি তখন কুমিল্লায় সাহেবাবাদ ডিগ্রী কলেজে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করি আর আমার স্ত্রী নিগার সুলতানা শাহীন হোমনা ডিগ্রী কলেজে রসায়নের অধ্যাপক। দুই কলেজের মাঝে ব্যবধান শত্তুর মাইলেরও বেশী। খুব টানাটানির সংসার – অনেকটা অপুর সংসার। এ নামটি আমার বড় মামা- শ্বশুরের দেয়া। উঁনি অফিসের কাজে একবার হোমনা এসেছিলেন। তখন ভাগ্নিকে দেখতে এলেন আমাদের বাসায়। বাসায় এসে উঁনি পুরোপুরি হতবাক। বললেন – শাহীন এ যে দেখছি একটা অপুর সংসার। সংসারের মালামাল বলতে দুটো প্লেট, দুটো গ্লাস – একটি সিঙ্গেল খাট আর দুটো সোলার কুকার।

আমরা থাকতাম হোমনা হেলথ কমপ্লেক্সের ডাক্তারদের রেসিডেন্সে – বিশাল বাসা কিন্তু বিদ্যুৎ আসেনি তখনো। তাই রান্না হতো স্টোভে অথবা ছাদে রাখা সোলার কুকারে / ওভেনে। সেই সময়ে সাইন্স ল্যবরেটরীর জ্বালানী গবেষণাগারের তৎকালীন পরিচালক ডঃ মোহাম্মদ ইউসুফ সাহেবের দেয়া এই সোলার কুকার গুলো ছিল বিনে খরচে রান্নার জন্য এক বিশাল অবলম্বন। শাহীন তখন অধিকাংশ সময় থাকে হোমনাতেই – কারন সন্তান সম্ভাবা মায়ের আতিরিক্ত ভ্রমনে বারন আছে। আমাকে তখন যেতে হোত সাত স্মূদ্দুর পাড়ি দিয়ে প্রতি সপ্তাহান্তে। কলেজে চাকুরী করি বলে সুবিধা ছিল একটু বেশী – আমি সপ্তায় তিন দিনে সব ক্লাস নিয়ে বাকি চারদিন ফ্রি থাকি, সময় কাটাই হোমনায়। ভালই যাচ্ছিল আমাদের দিনকাল – শুধু সমস্যা ছিল এই শত্তুর কিলোমিটার রাস্তা। মাঝে তিন চারটি নদী পার হতে হতো নৌকায়। তাও ভালো লাগতো – মনে হতো এটিই আমার সংসার, এটিই আমার আসল ঘর। আমি জানিনা কি সে আজানা টান – শহরের সূরম্য অট্টালিকা ছেড়ে সময় পেলেই দৌড়াই হোমনায়। হাওর থেকে আনা পাঁচ মিশালী ছোট মাছ আর রক্ত শাপলার ভাজি, তাও মেখে জুখে একবাবে সোলার ওভেনে রান্না। সেই কি মজা – সারাক্ষনই আমাকে টানতো দ্বীপ শহর হোমনা।

- Advertisement -

এরপর দেখতে দেখতেই এলো সেই ক্ষন, সেই শুভ ক্ষন – আমার শ্বাশুরী যোবায়দা ক্লিনিকের দোতালা থেকে দৌড়ে হাফাতে হাফাতে নীচে নেমে চিৎকার করে বলতে থাকলেন: সাইফুল তোমাদের ছেলে হয়েছে। তখন রাতের মধ্য প্রহর –আমি ক্লিনিকের নীচ তলায় গেস্ট রুমে বসে ঝিমুচ্ছিলাম। বুঝে উঠতে পারছিলাম না আমাকে তখন কি করতে হবে – কি বলতে হবে শ্বাশুরীকে । আমি কিছুক্ষন কিংকর্তব্যবিমুড় ছিলাম – তারপর আনন্দ অশ্রু। সে কি আনন্দ! মনে হয়েছে আমি আজ পৃথিবীর সবচেয়ে সূখী মানুষদের একজন।

সময় গড়িয়েছে অনেক- দিনে দিনে বহুদিন, ক্ষণে ক্ষণে বহুক্ষণ। শিশু-কৈশোর পেড়িয়ে আজ এই প্রত্যুষে সাতাশে পা দিয়েছে শাওন (Shaon Bhuiyan)। আজ থেকে ছাব্বিশ বছর আগের কথা। আমি আমাদের হোমানার বাসায় গেলাম – তখন দূপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। দরজা খুলে মাত্র ভিতরে ঢুকেছি। দেখি শাওন হামাঘুরি দিয়ে সারা ঘর চষে বেড়াচ্ছে। আমি তখন মনে মনে ভাবছি কাছে গিয়ে কোলে তুলে নেব ওঁকে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সে নিজেই উঠে দাঁড়ালো সোজা হয়ে। সারা দুনিয়ার বিস্ময় নিয়ে আমি যখন ওঁর দিকে তাকিয়ে ঠিক তখনই পেলাম আসল চমক। ও হাঁটতে শুরু করেছে তরতর করে এবং বারো ফুট রাস্তা পাড়ি দিয়ে এক লাফে উঠলো আমার কোলে। তাঁর আর হাসি থামে না – হয়তো তাঁর শিশু-সুলভ হাসিতে আমাকে বুঝাতে চেয়েছে বাবা দেখ! আমি কতো বড় হয়েছি – নিজের পাঁয়ে নিজে যেমন দাঁড়াতে শিখেছি, তেমনি হাঁটতেও শিখেছি একাই।

জন্মদিনের এই শুভক্ষনে বাবা মা হিসেবে আমরা আনন্দিত এবং গর্বিত। বড় হও আরো – নিবেদিত হোক তোমার জীবন মানুষের উপকারে আর সমাজের কল্যানে।

 

উইন্ডসর, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent