
কালচক্র আবর্তিত হচ্ছে, আবর্তিত হচ্ছে অনন্ত মাহাকাশের গ্রহ তারকা আর নিহারিকা পুঞ্জ। এই আবর্তন এবং পরিক্রমন নৃত্যের ছন্দে ছন্দে আমাদের এই নৃত্যশীলা ধরনী বক্ষে কতো না ঘটনা ঘটছে। আমরা কয়জন এর খবর রাখি কিংবা কতটুকুই বা জানি।
এ মুহুর্ত্যে আমাদের এই উইন্ডসরে ঝরছে বরফ আঝোরে।
আজই এখানে এই মৌসুমের প্রথম বরফ দিন। নীল দিগন্তে বইছে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া। বরফে ঢাকা সাদা আকাশ ঢেকে দিয়েছে মৃয়মান সূর্যের গোধুলী রঙ। জানান দিচ্ছে আর একটি সাদা চাদুর মোড়ানো ধবল রাতের। জানালার কাঁচগুলো ঢেকে গিয়েছে বিন্দু বিন্দু বরফ কনায়। হয়তো মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে স্ফটিক স্বচ্ছ কাঁচের জানালায় তাকিয়ে মনে হবে কোন এক শান্ত সকাল।
যদিও এই সময়ে দেশে হয়তো হাল্কা শীত।
হয়তো কোন এক গাঁয়ের বধূ মাটির উনুনে খেজুর রসের পায়েস তৈরী করছে। আবার কেউবা শিশির ভেজা দুর্বা ঘাসের উপর দিয়ে মেটো পায়ে হেঁটে যাবে ছোট্ট এক গাঁয়ের বাজারে। খুব মনে পড়ে ছোট বেলার কথা। মামার বাড়ি থেকে আধা ক্রোশ পথ পাড়ি দিয়ে, কাঁঠের সাঁকো পেড়িয়ে যেতে হতো গাঁয়ের বাজারের সেই বটতলায়। বাজারের এক কোনে ছিল ছোট একটি ভ্রাম্যমান চা দোকান। সবাই গোল বেঁধে বসতো আগুন পোহাতে আর একই সাথে খেতো গুড়ের চা। যদিও আমি তখন চা খেতাম না কিন্ত যেতাম গাঁয়ের বাজারে গাঁয়ের লোকজনের সাথে গল্প করতে আর আগুন পোহাতে। খুবই উপভোগ্য এবং মজার ছিল সেই দিনগুলো।
কোন এক শীতের বিকেলের কথা।
ঘুঙ্গুরী গাঙ্গের পাড়ের সেই গাঁয়ের বাজার। অনেকেই চাঁদুর গাঁয়ে জটলা পাকিয়ে বসে আছে, এক কোনে থাকা সেই রশীদ মিয়ার চা দোকানে। দোকানী ব্যস্ত তাঁর সব ভ্রাম্যমান সরঞ্জাম নিয়ে – চা তৈরী হবে অল্পক্ষণের মধ্যেই। আগুন জ্বলছে উনুনে – রশীদ মিঁয়া বিশাল এক কেটলী নিয়ে হন্ত দন্ত হয়ে ছুটছে গাঙ্গের দিকে। ত্রিপুরার পাহাড় থেকে নেমে আসা এই গাঙ্গের সব পানিই দেখতে হলুদ, পাহাড়ী মাটি মিশানো। অবাক ব্যপার এই যে – সেই পানিতেই বানানো চা সবাই খেলো খুব তৃপ্তি সহকারে, সাথে রসালো গল্পতো আছেই। আমাকে বললো: ভাগ্নে দুশ্চিন্তার কোন কারন নেই, কথায় বলেনা-
“নদীর পানি ঘোলাও ভালো
জাতের মেয়ে কালোও ভালো।।”
এটাই হয়তো সত্যি ছিল এককালে।
বড় বিচিত্র এই পৃথিবী এবং তাঁর চেয়েও বিচিত্র এঁর সব সরল মানুষ গুলো। আর তাই হয়তো এই যন্ত্রদানবের যুগেও আমরা দেখি দেশে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কিছু লোক এখনো তীর ধনুক উঁচিয়ে নিজেদের আত্মরক্ষায় সিনা টান করে নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকে পুলিশের স্বয়ংক্রিয় বন্দুকের সামনে। বলে এই আমার দেশ।
এইতো আমার মুল্লুক, আমার বাংলাদেশ।
উইন্ডসর, কানাডা
