দিনে দিনে বহুদিন, ক্ষণে ক্ষণে বহুক্ষণ

দিনে দিনে বহুদিন ক্ষণে ক্ষণে বহুক্ষণ

এভাবেই বয়ে গেল আমাদের যাপিত যুগল জীবনের পঁচিশটি বছর।

মনে হয় এইতো সেদিনের কথা- শীতের চাদুর মুড়ি দিয়ে গেলাম বন্ধু সুজিতের বাসায়। উদ্দেশ্য বিয়ের পাত্রি সম্পর্কে ওর মাধ্যমে একটু খোঁজ খবর নেয়া। সুজিত মাস্টার্সে এক বছর খুঁইয়ে সাতাশি ব্যাচে পরীক্ষা দিয়েছে। তাই আমাদের পরের ব্যাচের ছেলে মেয়েদের অনেকের সাথে ওর যোগাযোগ ভালো। সুজিত বললো আমি নিগারকে ভালোভাবেই চিনি এবং জানি, তবে ওঁদের বাসায় যাইনি কখনো। একটু কনজারভেটিভ ফ্যামিলি – তাই তোকে নিয়ে হুট করে যাওয়া ঠিক হবে না। তবে চিন্তার কোন কারন নেই, ব্যবস্থা একটা হয়তো করা যাবে। চল সুকেশের বাসায় যাই। সুকেশের ছোট বোন শোভনা নিগারের স্কুল বান্ধবী তাই সুকেশের সাথে যোগাযোগটা আমার চেয়ে বেশী। বিলম্ব না করে গেলাম সুকেশের বাসায় এবং ওঁকে পেয়েও গেলাম। সব শুনে সুকেশ নিজেও খুব এক্সাইটেড। সে আমাকে কয়েকটা গ্রুপ ছবি দেখালো, যা কোটবাড়ীতে তোলা ক্যমিস্ট্রির ডিপার্টমেন্টাল পিকনিকের। অবাক হয়ে আমি আমার নির্বাচিত মানুষটির ছবিটি বারবার দেখছি আর ভাবছি এতো দেখি আমার কল্পনার জগতে আঁকা কোন এক চির চেনা ছবি। আমি কি তাহলে প্রথম দেখায় কারো প্রেমে পড়েছি?

- Advertisement -

সুকেশ কিছুতেই না জানিয়ে কারো বাসায় গিয়ে হানা দিতে রাজি হোচ্ছিল না। তাও আবার বন্ধুর বন্ধুকে সাথে নিয়ে! বললো যদি ওঁরা বুঝতে পারে এবং বিষয়টি জানাজানি হয় তাহলে আমাকে যে খালু এতো স্নেহ আর বিশ্বাস করেন সবই শেষ হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত অনেক বুঝিয়ে সুকেশকে রাজি করালাম যে, ও কথা বলবে আর আমি বাসার গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আমার কল্পনার সে মানুষটিকে একটু দেখবো। হাঁটছি তিন বন্ধু শীত মাখা মায়াবী বিকেলের রোদে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম ঠাকুরপাড়ার রাম কৃষ্ণ আশ্রম রোডের সেই ছায়া ঢাকা নীড়ে। গেটে কড়া নাড়তেই বাড়ীর বড় কর্তা মানে আমার হবু শ্বশুর মশাই নিজেই এসে হাজির। বাবা পড়বি তো পড় মালির ঘাড়েই ! ভাবলাম সব আশায় গুড়ে বালি আজ। কিন্ত আমার সব দূরাশা সাঙ্গ হলো কয়েক মিনিটের ব্যবধানেই। ভেতর থেকে ডাক এলো বৈঠক খানায় বসতে। শ্বশুর মশাই বললেন: তোমরা বসো, চা খাও – নিগারের সাথে কথা বলো। আমি মসজিদ থেকে আছরের নামাজ শেষ করে ফিরছি, অল্প সময়ের মধ্যেই। সুজিত ড্রইং রুমে ঢুকেই খুব তড়িৎ গতিতে কে কোথায় বসবে ঠিক করে ফেললো, যাতে কথা বলতে সহজ হয়। শুরু হলো আড্ডা – কেঊ দেখলে হয়তো বলতো আড্ডাতো নয় বরং এ এক চিরচেনা বন্ধু মেলা।

তারপর চা নাস্তার ফাঁকে ফাঁকে নিরন্তর কথা বলা।

মনে হচ্ছে আজন্ম চেনা একজনের সাথে গল্পে বসেছি আজ। সুজিত আর সুকেশ একজন অন্য জনের দিকে তাকাচ্ছে, মনে হচ্ছে ভেতর থেকে কিছুটা মুচকি হাসছে। আজকের এই বন্ধু সভায় বক্তা শুধু আমি একজন আর শ্রোতাও আমার সাথে শুধু একজন। বাকি দু’জন শুধু নাম মাত্র বসে বসে কথায় সায় দিচ্ছে – এই যা। শুনেছি মানুষ কাউকে দেখে অভিভুত হলে বাকরুদ্ধ হয় কিংবা জানা কথাও তখন বেমালুম ভুলে যায় – কিন্তু আমার ক্ষেত্রে হলো এর বিপরীত। কথা চলছে আর থামে না – মনে হচ্ছে এর আর শেষ নেই। আসলেই তাই, ভাগ্যচক্রে আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে যে কথার শুরু, তার আর ইতি ঘটেনি আজও। সূখে-দূখে, আনন্দ-বেদনা আর হাসি-কান্নায় হৃদয়ের সব আকুলতার প্রকাশ ঘটেছে চোখে চোখ রেখে, পথ চলেছি হাতে হাত রেখে। এক অতি বিস্ময় আর মজার ব্যপার হলো পাত্র-পাত্রি দু’কুলের এক কুলও তখন টের পায়নি এই ব্যতিক্রমী পাত্রি দর্শনের বিষয়টি।

আজ আমাদের বিবাহ বার্ষিকীর পঁচিশ বছর পূর্তিতে শুকরিয়া মহান আল্লার কাছে। কৃতজ্ঞতা বাবা- মা- ভাই- বোন সহ সকল আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুদের কাছে, যারা আমাদের দিয়েছেন প্রগাঢ় ভালোবাসা এবং আন্তরিকতা, চলার পথ করেছেন কুসুমাস্তৃন।

আমাদের বর্ষপূর্তির এই শুভ লগ্নে সবার জন্য রইলো অনেক অনেক শুভ কামনা ।

উইন্ডসর, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent