জিগরচাঁন

জিগরচাঁন

আমাদের বাড়িটি ছিল আম গাছে ঘেরা। প্রচুর আমগাছ বাড়ির চারপাশের সীমানায় দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। ফলে এইসব আম গাছের শুকনো পাতা অবিরাম বাতাসে বাড়িতে ছড়িয়ে পড়তো। কিন্তু ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই বাড়ির সকল পাতা ঝাড়ু দিয়ে জিগরচাঁন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে ফেলতেন। পরিচ্ছন্নতার দেবী ছিলেন তিনি। কাপড় ধোয়া তাঁর এক বাতিক ছিল। ঝকঝকে চকচকে কাপড় হতে হবে৷ দামী না হোক। কিন্তু পরিচ্ছন্ন হওয়া চাই।

আমাদের বাড়িতে তিন দাদার সংসার। বাড়ির তিন দাদার মধ্যে আমার দাদা হুসেন আলী ছিলেন সবার ছোট। হুসেন আলীর ছোট আরেক ভাই ছিলেন। সুরত আলী। সুরত আলী ডাক্তারী পেশায় ও সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য প্রথমে শ্রীমঙ্গল ও পরে হবিগঞ্জ শহরে বসবাস করতেন। তাই, বাড়িতে আমাদের তিন দাদার তিন বাড়ির তিনঘরে তিন সংসার। উত্তর দক্ষিণে লম্বালম্বি আমাদের বাড়িটি ছিল দক্ষিণ অংশে। বাড়িতো আসলে একটিই। তিন উঠোনের তিনটি ঘরের তিন সংসার, এই যা। এই তিন ঘরের যে কোন এক ঘরে বাজার সদাই করে মাছ তরকারি নিয়ে আসলেই জিগরচাঁন দৌড় দিয়ে গিয়ে থলে উল্টিয়ে কুলা অথবা পাটিতে কুটা কাটা শুরু করে দিতেন। যেন তিনটি সংসারেরই কাজের আনন্দ তাঁকে উজ্জীবিত করে রাখতো।

- Advertisement -

জিগরচাঁনের হাতের রান্নার সুনাম ছিল খুব। গ্রামের মানুষ যেভাবে কম মশলা তেলে রান্না করে অভ্যস্ত, জিগরচাঁন ছিলেন তার উল্টো। শহুরে রান্নার মতো জিগরচাঁনের রান্নায় তেলে মশলায় এক আভিজাত্য ফুটে উঠতো। কিন্তু স্বাদের ক্ষেত্রে গ্রামের প্রাকৃত রসটি থাকতোই। তখন গ্রামের তরিতরকারি মাছ বা মাংসের নিজস্ব স্বাদই এমন ছিল যে, মশলা-তেলের আধিক্য রান্নার স্বাদকে বাড়িয়ে দিতো বৈ কমাতো না।

জিগরচাঁনের রান্নার বিখ্যাত একটি পদ কচুরলতির সালুন। শায়েস্তগঞ্জ হবিগঞ্জ অঞ্চলে ওলকচু ও কচুরলতির অত্যন্ত ভালো ফলন হয়। ওলকচু ও লতির চাষ করে বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। এই অঞ্চলের কচুর লতির আলাদা সুনাম আছে। যেমন মোটা তেমনি আলুর মতো মুখির গাঁট। রান্নার পর এই গাঁটগুলো নরম আলোর মতো মিইয়ে যেতে উদ্যত হয়ে থাকে। ফলে, লতির তরকারি আরো ঘন হয়। জিগরচাঁন বিশাল করে লতির তরকারি রান্না করতেন। ইলিশ মাছ অথবা বড় চিংড়ির সাথে বেশী করে পুটি মাছের সিদল (চেপা শুটকি) জিগরচাঁনের রান্না করা লতিকে অসাধারণ স্বাদ এনে দিতো। এই অসাধারণ লতিও অমৃত স্বাদের রূপ ধারণ করতো একদিন পরের জাল দিয়ে ঘন করা সেই সালুনটি। এক লতির সালুন দিয়েই অনায়াসে প্লেটের ভাত সাবাড় করা যেত। একবেলার লতির সালুনের স্বাদ তিনবেলা হাতে লেগে থাকতোই।

জিগরচাঁনের ছিল ছয় সন্তান। পাঁচ পুত্র এক কন্যা। আমার আব্বা ছিলেন বড় পুত্র। আব্বার এক ছোট ভাই বেশ বড় হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। বাকী সবাই বিয়ে সাদী করে সংসারী হয়েছেন। আমি জিগরচাঁনের বড় নাতি। স্বভাবতই আমার প্রতি তার দুর্নিবার স্নেহ ছিল। আমাদের বাড়ির দাদিদেরকে আমরা সবাই দাদাভাই বলে ডাকি। এই দাদাভাইকে সংক্ষেপে ভাই বলি। আমারও আমার ভাইয়ের প্রতি অপার টান ছিল। আমাদের ভাই খুব রসিক ছিলেন। খুব হাসাতে পারতেন৷ নিজেও হাসতেন মন প্রাণ উজাড় করে। শেষ দিকে মানুষকে চিনতে পারতেন না। গতবছর দেশে গিয়ে আমি তাঁর সামনে যাওয়ার পর হাসতে হাসতে শেষ৷ আমার চাচাতো ভাইবোনরা ভাইকে জিগ্যেসে করলো -‘ ইলা কেলা, চিনছো নি!’ [ ইনি কে চিনতে পারছেন? ] আমার দিকে চেয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে হাসতে হাসতে বলছেন- ‘হিলা কই? হিলারে নিয়া আইছো না!’ [ মানে সে কোথায়? আমার স্ত্রী শিউলিকে বুঝিয়েছেন। শিউলিকে নিয়ে আসোনি?] বলতে ভুলে গেছি ভাই খুব মাথা ঝাঁকাতেন। তবে, এই ঝাঁকুনি ছিল ইতিবাচকতার ইঙ্গিত বা চলতি প্রসঙ্গের প্রতি সায় দেয়ার মনোভাব। বড় ভালো লাগতো এই মাথা ঝাঁকুনি। কোন শব্দ নেই, ব্যাখ্যা নেই, কিন্তু সম্মতির সুন্দর এক স্নিগ্ধ সূচক।

বেশ হাসি খুশিতেই জীবনটা কাটিয়ে দিলেন ভাই। শুধু ‘৭১ সালে তাঁর দিনরাত উৎকণ্ঠায় কেটেছে। দুই ছেলে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে। বেঁচে আছে কী না জানেন না! কোথায় আছে জানেন না। রাত হলেই গভীর শংকায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হতো। কুকুরের কান্নায় বাতাস ভারি হয়ে যেত। দূরে কোথাও পোড়ানো ঘরবাড়ির আগুনের হলকার ফুলকি বাতাসে মরণের গন্ধ বিলিয়ে দিতো। একেকটি রাত হতো ফুলসিরাতের পুলের মতো লম্বা। দিনে খোয়াই নদীতে ভেসে যাওয়া মানুষের বিশাল মরদেহ দেখার ভয় আমাকে কুঁকড়ে দিতো। সেই ভয়ের সকল ভার রাতে এসে ঝাঁকিয়ে রাখতো। ভাই সারারাত আল্লাহর নাম জপতে থাকতেন। উঠোনের চারিদিকে উৎকীর্ণ কানে তাকিয়ে থাকতেন। বুঝতাম, মৃত্যুর ভয় দূরে রেখে দাদাভাই ছেলেদের আগমনী সন্ত্রস্ত পায়ের শব্দের জন্য কান উৎকীর্ণ করে চারিদিকে চেয়ে সারারাত কাটিয়ে দিতেন! বাড়িতে আমি আর ভাই ছাড়া আর কেউ তখন ছিলেন না। সেই সময়ের ভাইয়ের হতবিহবল মুখের ভাষা বর্ণনার শক্তি আমার নেই! আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে কাপড়ের আঁচল দিয়ে ভাই চোখ মুছতেন! কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর তাঁর খুশি দেখে কে! গর্বে আনন্দে তিনি সবসময় টইটুম্বুর থাকতেন।

আমার আব্বার মৃত্যুর সময় ভাই তাঁর বড় ছেলেকে কোলে করে বিদায় দিয়েছেন। দাদা ভাইয়ের মৃত্যুর সময় মুক্তিযোদ্ধা ছেলের হাতেই তাঁর মাথাটি ছিল। তাঁর বড় পুত্রবধু আমার আম্মাও পাশে ছিলেন। একটি জীবনকে আমার দাদাভাই উদযাপন করে গিয়েছেন।

বাড়িতে গিয়ে আর কোনদিন ভাইকে দেখতে পাবোনা! আম্মাকেও না!

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent