হাঁসুলির হেঁয়ালি

হাঁসুলির হেঁয়ালি

পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার—প্রাচীন স্থাপত্যের এক জীবন্ত সাক্ষী। এর অন্তর্গত প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে সংরক্ষিত ছিল বহু অমূল্য নিদর্শন। তবে তাদের মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় ছিল”মায়াবিনী হাঁসুলি”। মূর্তিটি এক বিশেষ ধরনের ধাতু দিয়ে তৈরি, যার উৎস অজানা। প্রাচীন মুনি ঋষিদের বানী হচ্ছে, এটি প্রাচীন তন্ত্রমন্ত্রে ব্যবহৃত হত, এবং এর শক্তি ধারণ করত অনন্ত রহস্য।

এক রাতে, হঠাৎ করেই মায়াবিনী হাঁসুলি জাদুঘর থেকে চুরি হয়ে যায়। কিন্তু চুরির কোন চিহ্নই মেলে না। শুধু পাহারাদারের কথায় জানা যায়, গভীর রাতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল, এবং কোনো অদ্ভুত গন্ধ ছড়িয়ে পরছিল। যেন সেই রাতের মধ্যেই অদ্ভুত কোন প্রাচীন শক্তি ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে।

- Advertisement -

ড. নীলা চৌধুরী, একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ, এই নিখোঁজ ঘটনায় নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তবে ঘটনা আরো জটিল হয়ে ওঠে, যখন সিআইডি গোয়েন্দা ফিরোজ আলম জানতে পারেন, এই মায়াবিনী হাঁসুলির পেছনে আন্তর্জাতিক কালো জাদু চক্রের একটা হাত রয়েছে। স্বভাবতই ফিরোজ এই রহস্য সমাধানের দায়িত্ব পান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকে।

ফিরোজ আলম পাহাড়পুরে পৌঁছে প্রথমেই পর্যবেক্ষণ করেন জাদুঘরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সেখানে এমন কিছু চিহ্ন তিনি খুঁজে পান, যা স্বাভাবিক কোনো বাংলাদেশী চুরির কৌশলের সঙ্গে কোনভাবেই মেলে না। একটি কাচের শো-কেস, যেখানে হাঁসুলিটি রাখা ছিল, তার উপর অদ্ভুত ছাইয়ের দাগ মিশে আছে।

ড. নীলা একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেন। তিনি বলেন, “এই ছাই সম্ভবত সিঙ্গাপুর থেকে আনা এক প্রাচীন কালো মন্ত্রের অংশ, যা পবিত্র নিদর্শন চুরি করতে ব্যবহৃত হয়।” আরও জানান, একটি গোপন বইতে এই মন্ত্রের উল্লেখ রয়েছে, যার নাম “নক্তমন্ত্র”। বইটি বর্তমানে কলকাতার এক রহস্যময় সংগ্রাহকের কাছে রয়েছে।

ফিরোজ সিদ্ধান্ত নেন, কলকাতায় গিয়ে রহস্যের সূত্র বের করবেন। নীলা তার সঙ্গে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

কলকাতায় এসে তারা গোপন সংগ্রাহকের খোঁজ পান। তার নাম মিস্টার অরুণাভ রায়। তিনি প্রথমে কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান, তবে নীলা একটি পুরনো সম্পর্কের সূত্র ধরে তার বিশ্বাস অর্জন করেন। অরুণাভ জানান, “নক্তমন্ত্র” বইতে এমন একটি শক্তির কথা বলা হয়েছে, যা সময় আর স্থানের নিয়ম ভেঙে দিতে পারে।

ফিরোজ এবং নীলা জানতে পারে, মায়াবিনী হাঁসুলির সঙ্গে এর যোগসূত্র প্রকৃতপক্ষে তার তান্ত্রিক শক্তিতে নিহিত। ফিরোজ সেই নক্তমন্ত্র বই থেকে অজানা শক্তির মন্ত্রের যাবতীয় সব কিছুর ছবি তুলে নিয়ে যান তার মোবাইলে। তবে হাঁসুলিটি পাচারের জন্য ধনী চোরাচালানকারী “লুসিয়াস ব্ল্যাক” ইতোমধ্যে ঢাকায় এসে পৌঁছেছে।

লুসিয়াস ব্ল্যাক—এক রহস্যময় এবং কুখ্যাত চোরাচালানকারী। তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু অমূল্য প্রাচীন নিদর্শনের চুরি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সেগুলোর বিক্রির অপকর্মের ইতিহাস। তিনি কেবল চোর নন, বরং একজন তান্ত্রিক বিশ্বাসী, যিনি প্রাচীন শক্তিকে আধুনিক ক্ষমতার সঙ্গে মিশিয়ে নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টায় লিপ্ত। ঢাকায় এসে তিনি স্থানীয় এক চক্রের সঙ্গে মিলে পাহাড়পুরের এই অমূল্য হাঁসুলিটি পাচারের পরিকল্পনা করেন। এই চক্রটি স্থানীয় প্রভাবশালীদের মদতে পরিচালিত হয়, এবং তাদের সঙ্গে রয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও রহস্যময় তান্ত্রিক জ্ঞান।

ঢাকার সোনারগাঁ অভিজাত হোটেলে লুসিয়াস তার সহযোগীদের নিয়ে গোপন বৈঠক করে। বৈঠকে উপস্থিত থাকে স্থানীয় কিছু শীর্ষ চোরাচালানকারী এবং কিছু নাইজেরিয়ান বিদেশি কালো জাদুবিদ। লুসিয়াস তাদের বলেন, “মায়াবিনী হাঁসুলির শক্তি কেবল এর ধাতব মূল্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি এমন এক পবিত্র শক্তি, যার ক্ষমতা সময় আর স্থানের সীমা ভাঙতে পারে। আমাদের পরিকল্পনা সফল হলে, আমরা এই শক্তিকে ব্যবহার করে এমন কিছু করতে পারব, যা ইতিহাসে কেউ কল্পনাও করেনি,কোন চোখ সেই ক্ষমতা দেখেনি,কোন কান সেই ক্ষমতার আওয়াজ কখনো শোনেনি।”

ঢাকায় ফেরার পর ফিরোজ একটি গোপন অপারেশনের পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনার জন্য তিনি প্রথমে পাহাড়পুরে নিযুক্ত পুরাতত্ত্ব বিভাগ এবং পুলিশের গোপন সংস্থার কাছে একাধিক তথ্য চান। তাদের মাধ্যমে জানা যায়, স্থানীয় কয়েকজন চোরাকারবারির আচরণ সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিক ছিল। বিশেষ করে এক স্বনামধন্য স্থানীয় ব্যবসায়ী আদিলের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বিদেশি একটি সংস্থার।

ফিরোজ তখন তার বিশ্বস্ত সোর্স সোহেলকে কাজে লাগান। সোহেল—ঢাকার অপরাধজগতের অনেক গভীর তথ্য জানার ক্ষমতা রাখে। সোহেল তার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জানতে পারে, লুসিয়াস ব্ল্যাক নামের একজন বিদেশি ঢাকায় এসে সোনারগাঁ হোটেলে উঠেছেন।

সোহেলের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ফিরোজ হোটেলটির চারপাশে নজরদারি বসান এবং সেখানে গোপন ক্যামেরা স্থাপন করেন। এর মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, লুসিয়াস রাতে একটি মিটিং করছেন, যেখানে কিছু স্থানীয় অপরাধী এবং বিদেশি ব্যক্তিত্ব উপস্থিত থাকবে। সেই মিটিংয়ে পাহাড়পুরের জাদুঘর থেকে চুরি হওয়া হাঁসুলি নিয়ে আলোচনা হয়।

এরপর ফিরোজ সোহেলের সহায়তায় এক স্থানীয় ছিঁচকে চোরাচালানকারীকে ধরে জেরা করেন। সেই চোরাকারবারি ভয়ে সবকিছু স্বীকার করে। সে জানায়, লুসিয়াস এবং তার দল পাহাড়পুরের কাছাকাছি একটি পুরনো পোড়ো বাড়িতে অবস্থান করছে, যেখানে তারা এক তান্ত্রিক আচারক্রিয়া সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করেছে। এই তথ্য নিশ্চিত করার পরই ফিরোজ তার অপারেশন শুরু করেন।

ফিরোজ তার দল নিয়ে পোড়ো বাড়িটির দিকে অগ্রসর হন। বাড়িটির চারপাশে গোপনে নজরদারি করে তিনি দেখেন, সেখানে একদল সশস্ত্র চোরাচালানকারী পাহারা দিচ্ছে। ভিতরে একটি কক্ষ থেকে ভেসে আসছিল তান্ত্রিক মন্ত্রের আওয়াজ। মন্ত্র পাঠ করছিলেন লুসিয়াস ব্ল্যাক নিজে।

অপারেশন শুরু হয় গভীর রাতে। ফিরোজ এবং তার দল এক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় বাড়িটির চারপাশ থেকে ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে। কিন্তু তাড়াতাড়ি তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে যায় চোরাচালানকারীরা। শুরু হয় প্রচণ্ড গুলি বিনিময়।

ফিরোজ তার স্নাইপার টিমকে নির্দেশ দেন গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলো বন্ধ করতে। গুলির শব্দে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। একদিকে স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় বাড়িটি ঘিরে ফেলা হয়, অন্যদিকে ফিরোজ নিজেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে চোরাচালানকারীদের আটকানোর চেষ্টা করেন।

ভেতরের একটি ঘরে লুসিয়াস তার শেষ মন্ত্র পাঠ করছিলেন। ফিরোজ সেই কক্ষের দরজা ভেঙে ঢুকে পড়েন। লুসিয়াস পালানোর চেষ্টা করলেও ফিরোজ তার পায়ে গুলি করে লুসিয়াসের পলায়ন আটকাতে সক্ষম হয়। তার হাতে থাকা হাঁসুলি ছিনিয়ে নিয়ে ফিরোজ তা বিশেষ সুরক্ষিত বাক্সে রেখে দেন।

বাইরে তখনও গুলি বিনিময় চলছে। শেষমেশ, পুলিশ পুরো চক্রটিকে ঘিরে ফেলে এবং সবাইকে গ্রেপ্তার করে। লুসিয়াসসহ পুরো গ্যাং ধরা পড়ে। বাড়িটি তল্লাশি করে উদ্ধার করা হয় আরও বেশ কিছু চুরি হওয়া প্রাচীন নিদর্শন। সেই সাথে প্রচুর পরিমানে বিদেশি হ্যান্ড গ্রেনেড, এক-৪৭ এসল্ট রাইফেল, রাইফেলের গুলি, সাইলেন্সার সহ হ্যান্ড গান এবং বেশ কয়েকটি বাজুকা এবং প্রায় নগদ ১ লাখ সমপরিমানের ইউ এস ডলার, কিছু ইউরো ডলার এবং কয়েক বোতল রাশিয়ান ভদকা।

মায়াবিনী হাঁসুলি ফিরে এসেছে, কিন্তু তার প্রকৃত শক্তি এবং অভিশাপ রয়ে গেছে রহস্যময়। ফিরোজ জানেন, এই শক্তির পেছনে থাকা চক্র হয়তো আবার সক্রিয় হবে। তবে একটাই সান্ত্বনা, দেশের এক অমূল্য সম্পদ আবারও তার সঠিক জায়গায় ফিরে এসেছে এবং এর অবৈধ পাচার শেষমেশ ঠেকানো গেছে।

এটি কি শুধুই একটি রহস্য, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো বৃহৎ পরিকল্পনা? এই প্রশ্নই যেন ভবিষ্যতের গল্পের ভিত্তি হয়ে থাকে।

- Advertisement -

Read More

Recent