জীবন ক্ষণস্থায়ী

জীবন ক্ষণস্থায়ী

চিতার আগুন এতোক্ষণে হয়তো নিভে গেছে। কিছু দেহাবশেষ সংগ্রহ করে নিয়ে গেছে নিকট আত্মীয়েরা। বাকী অংশ হয়তো জলে স্হলে অন্তরীক্ষে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। স্বামীহীন বিধবার নি:সংগতার হাহাকার আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এসেছে। পিতাহীন সন্তানের প্রথম রাতটা ভোর হতে শুরু করেছে। উদীয়মান সূর্য একই সময়ে সেই আগের মতই আলো ছড়িয়ে পৃথিবীতে আবার একটা নতুন দিনের সূচনা করছে। মহাকাল এভাবেই তো জীবনকে বয়ে নিয়ে চলেছে প্রজন্মান্তরে।

আজ মনটা ভারাক্রান্ত দুটি কারনে। এক, সহপাঠী বন্ধু পরিমলের অসময়ে হঠাৎ চলে যাওয়া। দুই, নিজের কথা ভাবছি- কোন প্রস্তুতিই তো আমার নেয়া হয়নি। যদি হঠাৎ ডাক আসে! হঠাৎ যদি সব ফেলে চলে যেতে হয়! আবার ভাবছি, জীবন তো এমনই। এর চেয়ে বড় কোন সত্যি তো জীবনের জন্য অবশ্যম্ভাবী না। তাহলে কেন আমি ভারাক্রান্ত হবো! এর ভাল কোন উত্তর আমি মেলাতে পারছি না।

- Advertisement -

পরিমল আর আমি একই হলের আবাসিক শিক্ষার্থী হিসাবে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা জীবন শুরু করেছিলাম। ও কোন ব্লকে কত নম্বর রুমে ছিল এতদিন পর আর মনে করতে পারছি না। হল জীবন শুরুর দিকে আমি রেল লাইন সংলগ্ন লেকে সাঁতার কাটতে যেতাম। যতদূর মনে পড়ছে পরিমলের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ওই লেকপাড়ে। প্রায় দিনই ওখানে আমাদের দেখা হতো। যদি ভুল করে না থাকি, ওর শরীরের কাঁধ থেকে কোমর পর্যন্ত একটা শক্ত সুতা জড়ানো দেখেছি। যেটাকে সম্ভবত পৈতে বলে। যতটুকু জানি, ওটা জীবনভর সংগে থাকে। আমার জানা নেই, খুব জানতে ইচ্ছা করছে স্বামী বা পিতার শেষ স্মৃতি হিসাবে রেখে দিতে পৈতেটা কি খুলে নেওয়া হয়েছে! যদি থাকে, সুযোগ হলে আমি দেখবো।

ও ডাইনিংয়ে খেতো। হল জীবনের প্রথম দিকে আমিও। ওখানেও প্রায়শ আমাদের দেখা হতো। আমাদের আরেক বন্ধু পরিতোষের সাথে ওর খুব বন্ধুত্ব ছিল। আমি রসিকতা করে দুই বন্ধুর নাম একত্রিত করে মলতোষ বলে ডাকতাম। খুব সরল মানুষ ছিল। কোন দিন কোন বিষয় নিয়ে রাগ হতে দেখিনি। পরিমলের শেষ সময়গুলোতে দুই বন্ধুর দেখা হবে বলেই হয়তো পরিতোষ এখন দেশে। পরিতোষ, বন্ধু, তুই পরিমলের নিথর মুখটা আমাদের হ‘য়ে ছুঁয়ে দিয়েছিস তো!

মানুষের একটাই জীবন। যা প্রদীপের মতই ক্ষণস্থায়ী। সমুদ্রের ঢেউয়ের উপর জমে থাকা বুদবুদের মত যে কোন সময় হঠাৎ মিলিয়ে যেতে পারি। জানা অজানা যে কোন দু:খ মনে রেখো না, ক্ষমা করে দিও বন্ধুরা। যদি আবার আমাদের দেখা হয় মুখটা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার আগে ছুঁয়ে দিও। হাতটা শক্ত করে ধ‘রো। যে যেখানে থাকো সবার জন্য অনেক শুভকামনা।

 

হ্যামিল্টন, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent