
বাঙালি এবং এদের “গজবের” ইন্টারপ্রিটেশন ভীষণ ইন্টারেস্টিং।
আমেরিকায় দাবানলে বিলাসবহুল এলাকা পুড়ে ছাই হলো, এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দশ। ক্ষতির পরিমান পঞ্চাশ বিলিয়ন। হয়তো মৃতের সংখ্যা একশো হবে (অনেক বাড়িয়ে ধরলাম), ক্ষতির পরিমানও ডবল ধরলাম, ১০০ বিলিয়ন। এখানে ক্ষতির পরিমান এত হয়েছে কারন যে এলাকা পুড়েছে সেখানে একেকটা ছোট বাড়ির দামই পাঁচ ছয় মিলিয়ন ডলার। যদি সাধারণ নেইবারহুড হতো, তাহলে ক্ষতির পরিমান কমতো। কাজেই ওটা আপেক্ষিক ধরে নেয়া যায়। যেটা ধ্রুব, সেটা হচ্ছে মানুষের জীবন। সে যে এলাকারই মানুষ হোক, প্রাণের মূল্য অসীম। সমস্ত পৃথিবীর বিনিময়েও একজন মৃত ব্যক্তিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না।
এটি একটি ভয়াবহ দুর্যোগ, সন্দেহ নেই। কিন্তু এইটাকে “আসমানী গজব” ট্যাগ দেয়াটা কি আল্লাহর ক্ষমতাকেই খাটো করে দেখা না? প্রতিবছরই ক্যালিফর্নিয়ার কোন না কোন অঞ্চল আগুনে পুড়ে। বেশিরভাগই মানুষের লাগানো আগুন থেকে। হয়তো সিগারেট টেনে ঠিক মতন নেভায়নি। অথবা ইচ্ছাকৃতই এই আগুন জ্বালানো – যার ফল আমরা প্রতিবছরই দেখি।
এটি আসমানী গজব হলে ফিলিস্তিনে মিলিয়নের উপর মানুষ শহীদ হয়েছেন, হাজারে হাজার পরিবার চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়েছে, লক্ষাধিক মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পৃথিবীর বিভিন্নপ্রান্তে জীবন কাটাচ্ছে… সবকিছুর শাস্তি “মাত্র” দশ থেকে একশো সিভিলিয়ানের মৃত্যু? ইজরায়েলের কিছুই হলো না, আমেরিকার লস এঞ্জেলেসের কিছু বাড়িঘর পুড়ে ছাই হলো। ব্যস? মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা, যিনি ন্যায় বিচারক, যিনি পরম করুনাময় ও একই সাথে কঠিন শাস্তিদাতা – তিনি কি এত অল্প ও দুর্বল শাস্তি দিবেন?
তারপরেও ধরলাম ওদের কথাই ঠিক। এইটা আসলেই গজব। সবগুলোই গজব।
তাহলে টার্কিতে যে কিছুদিন আগে ভূমিকম্পে ৫৫ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল, সেটাও কি “গজব?” টার্কিতো ফিলিস্তিনে হামলা করছে না।
এখানেও গজব থিওরির লোকজন থেমে নেই। টার্কির বিখ্যাত ডান্সিং আইসক্রিমওয়ালার ছবি মিডিয়াতে এসেছিল যে লোকটার বাড়িও ধ্বসে গেছে। সদা হাস্যোজ্জ্বল লোকটার বিমর্ষ মুখ দেখে খারাপ লাগছিল। এদিকে অসভ্য বাঙালিরা সেদিন কি কমেন্ট করেছিল জানেন? “খুব ভাল হয়েছে, আরও নাচাকুদা কর! আল্লাহ ছাড় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না।”
যেন নাচানাচি করে আইসক্রিম বিক্রি করা ঘুষ খাওয়া, কারোর অধিকার/হক মেরে দেয়া, ওজনে কম দেয়া, চিটারি বাটপারির চেয়েও বিরাট অপরাধ। এরই জবাবে আল্লাহ গোটা শহরকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন!
বাংলাদেশে বন্যায়, ভবন ধ্বসে (রানা প্লাজা) বা ভবনে আগুন লাগলে এর চেয়ে বেশি মানুষ মরে। তখন গজবওয়ালারা কি থিওরি পেশ করেন? আইয়ুব খানের আমলে সাইক্লোনে হাফ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিল, ৯১ এর সাইক্লোনে দুই লাখ। সাইক্লোন সিডরে আমাদের মৃতের সংখ্যা ছিল পনেরো হাজার। ব্রিটিশ আমলে দুর্ভিক্ষে এক তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা শেষ। এছাড়া নানান সময়ে নানান মহামারীতে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। তাহলে এগুলো কি সবই আসমানী গজব? তাহলে এখন প্রতিষেধক ও উন্নত চিকিৎসার ফলে মৃত্যুহার যে কমেছে, সেটা কি আল্লাহর গজবের বিরুদ্ধে মানুষের বিজয় হয়ে গেল না? যদি আসলেই আল্লাহর গজব হয়ে থাকে, তাহলে সেটার বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষমতা আছে কিছু করার? আল্লাহর গজব ঠ্যাকানো মানুষের পক্ষে সম্ভব? এরা কি কারোর কবরের মাটি ছুঁয়ে কসম খেয়েছে যে জীবনেও মাথা খাটাবে না?
যাই হোক, মূর্খের সাথে তর্কে জড়ায়ে লাভ নেই।
এখন আসি মূল পয়েন্টে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসছে। ওর উদ্দেশ্যই থাকে হোয়াইট সুপ্রিমেসিকে উস্কে দেয়া। এতে বর্ণবাদীরা উৎসাহিত হয়ে অনেক আকাম কুকাম শুরু করে। গতবার যেমন আমরা দেখেছিলাম নিউইয়র্কে বোরখাপরিহিতা এক রমণীর গায়ে আগুন জ্বালিয়েছিল, এক মুসলিম পুরুষের গাড়িতে চলন্ত অবস্থাতেই আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, ক্যানসাসে দুই হিন্দু ইন্ডিয়ানকে গুলি করে মেরেছিল, সিনাগগে মেশিনগান নিয়ে ঢুকে হত্যা করেছিল এক খুনি, সাতটি মুসলিম দেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, নিউজিল্যান্ডেও মসজিদে এক শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীর হামলায় পঞ্চাশজন মুসলিম শহীদ হন। আরও অনেক ঘটনাই ঘটেছে, এখন এই মুহূর্তে তালিকা দীর্ঘ করার কোন পয়েন্ট নেই।
বাইডেন সরকারের সময়ে গোটা দেশ মোটামুটি শান্ত ছিল। মুসলিমদের এমন কোন ঘটনা ঘটেনি যেটাকে ভাঙিয়ে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা উস্কানি দিতে পারে। সমাজে বিভিন্ন কাজে অবদান রাখার কারনে অনেক লোকাল লোকজনও ইসলাম সম্পর্কে নানান ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসে।
এমন সময়ে ক্যালিফর্নিয়ার দাবানলের ভিডিওগুলোতে কিছু মূর্খ বাঙ্গাল গিয়ে কমেন্টিং শুরু করেছে “আলহামদুলিল্লাহ!” “উচিত শিক্ষা হয়েছে।” “খুব ভাল হয়েছে।”
ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে যে গাজাবাসী ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি ভালবাসা থেকে এরা এসব করছে, সেই ফিলিস্তিনিরা কিন্তু কিছু বলছে না। উল্টা ওরা এক্টিভলি এই দুর্যোগ মোকাবেলায় সাহায্য করছে। লস এঞ্জেলেস আমেরিকার সবচেয়ে বেশি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার একটি। পশ্চিমা বিশ্বে যত আরব রিফিউজি বাস করে, এদের সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় মুসলিম এই এলাকায় বাস করে। কিছুদূর পরপর মসজিদের দেখা মিলে। হালাল দোকানের ছড়াছড়ি। ওরা বুঝতে পারছে ওদের প্রতিবেশীর বাড়িতে আগুন লাগার মানে আমার বাড়িতেও আগুন লাগতে বেশি দেরি হবেনা। প্রচুর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, প্রচুর বাড়িঘর পুড়ে ছাই হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় কোন মুসলিম নেই? অবশ্যই আছে। অথচ এই উজবুকরা কি বলে জানেন? “ওরা খাঁটি মুসলিম না। ওরা ওদের ট্যাক্সের টাকায় ফিলিস্তিনি হত্যা করে।”
ওরা নিজেরা জাতে ফিলিস্তিনি ও আরব, ওদের নিজেদের লোকেদের প্রতি ভালবাসা থেকে ওদের প্রতি তোমার প্রেম বেশি বলতে চাও?
কিন্তু এখন সাধারণ অমুসলিম লোকজন ভিডিওতে দেখছে বাড়িঘর পোড়ার দৃশ্যে, মানুষ ও পোষা প্রাণীর মৃত্যুর খবরে মুসলিমরা আসলে খুশি হচ্ছে। ওরা জানেনা কমেন্টকারী আব্দুল জব্বার বা বেলায়েত হোসেন কোন দেশের মানুষ, ওরা নাম থেকেই বুঝে এরা মুসলিম। এবং এর মানে ট্রাম্প সমর্থকরা ঠিক কথাই বলে, মুসলিমরা আসলেই সন্ত্রাসী জাত! সাধারণ অমুসলিমের মৃত্যুতে খুশি হয়!
যে মূর্খরা খুশিতে বাকবাকুম করছে, এরাই অভিযোগ করে ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুর ঘটনায় পশ্চিমারাও উল্লাস করে। তাহলে একই কাজ যখন তুমি নিজেও করলে, ওর চেয়ে তুমি কিভাবে উত্তম হলে? তুমিওতো একই ক্যাটাগরিরই অমানুষ!
কেউ কেউ আমাকে অভিযোগ করেছে আমি নাকি নিজের মত চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি। অথচ এইসব মহাজ্ঞানীদের কাছে যখন জানতে চাইলাম কুরআনের ৬৬৬৬ আয়াত বা লক্ষাধিক হাদিস থেকে একটা রেফারেন্স দেখাতে যেখানে আল্লাহ বা রাসূল (সঃ) সাধারণ মানুষের মৃত্যুতে বা ক্ষতিতে খুশি হয়েছে, কিংবা একজন অপরাধীর শাস্তি ওকে না দিয়ে ওর পরিবারের কাউকে দিয়েছে – আমি তাহলে লেখা ডিলেট করে লাইভে এসে কানে ধরে উঠবস করবো। কেউ দেখাতে পারেনি। উল্টো আমি দেখাতে পারবো যে বিদায় হজ্বের ভাষণে নবীজি (সঃ) নির্দেশ দিয়েছেন পিতার অপরাধে পুত্র বা পুত্রের অপরাধে পিতাকে শাস্তি দেয়া যাবেনা। ইসলামের অতি বেসিক নিয়ম এইটা।
ইসলামের নামে চালানো বহু মিথ্যা ধারণাকে পাল্টাতে বছরের পর বছর পরিশ্রম করতে হয়, অথচ এই মূর্খগুলির একেকটা কমেন্টই যথেষ্ট সেই ধারণাকে পাল্টে দিতে। না এরা মুসলিম হতে পারে, না পারে মানুষ হতে।
*** গত পোস্টে কেউ কেউ ইনিয়ে বিনিয়ে বলেছিল আমি নাকি আমেরিকায় থাকি বলেই শুধু আমেরিকার পক্ষেই এমন কথা বলি।
ফ্যাক্ট হচ্ছে, জ্বি না, আমি আমেরিকায় থেকেও ফিলিস্তিনিদের পক্ষে বিরতিহীন বলে যাই।
টার্কি ও নেপালে ভূমিকম্পের বেলায়ও বলেছি।
ইন্ডিয়াতে করোনার সময়েও ওদের জন্য টাকা তুলে পাঠিয়েছি।
এবং পাকিস্তানের পেশোয়ারে তালেবান হামলায় ওদের যখন শিশুরা নিহত হয়েছিল, তখনও একই প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলাম। আমি আমার নীতিতে কনস্ট্যান্ট। আমি সুশীলদের মতন “সিলেক্টিভ মানবতায়” বিশ্বাসী নই।
