প্রবাসে বাংলাদেশ

প্রবাসে বাংলাদেশ

এক. মেহজাবিন থেকে পরিমনি, অথবা, অপু বিশ্বাস থেকে এমি জান্নাত, এমন হাজার হাজার নারীরা যখন পুনরায় গৃহকে তাদের চুড়ান্ত গন্তব্য মেনে স্থির হয়ে থাকবে, তারও বহুবছর পরে তাদের হয়তো মনে পড়বে সেদিনের কথা যেদিন কোন রেস্টুরেন্ট কিংবা শো-রুম উদ্বোধন করতে গিয়ে তৌহিদি জনতার ক্ষোভের মুখে তাদের ফিরে যেতে হয়েছিল; তাদের কাওকে কাওকে বলা হয়েছিল, শো-রুম উদ্বোধন নায়িকাদের কাজ না; অথবা, কাওকে বলা হয়েছিল, ধর্ম মন্ত্রণালয়ে কোন নারী সাংবাদিক ঢুকতে পারবে না, তখন তাদের মনে পড়বে তারও ছয় মাস আগের কোন এক উষ্ণ দিনের কথা, যখন তারা কোন নারী শাসকের পতন চেয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিল এবং সারাদিন সারারাত রাস্তায় মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল এই আশায় যে, ডাইনিটা চলে গেলে সুদিন আসবে সুদিন! সেদিন তাদেরকে কেউ হয়তো সতর্ক করেছিল, অথবা করেনি, কারণ, ততদিনে তারা বিস্মৃত হয়েছিল এমন সব ঘটনা যা তাদের চারপাশে ঘটে চলেছিল, অথবা, তারা দেখেছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা ’কোটা চাই না,’ কিংবা ’তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজকার’ বলে আকাশ কাঁপাচ্ছিল, আর তা দেখে বিশ্বের দেশে দেশে হাজার হাজার নারীরা ’তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ বলে গর্বে ফেটে পড়ছিল; তখন তাদের হয়তো কেউ বলেছিল, এদের কপালে শনি নামছে, তখন তারা সেই সতর্কবাণীকে উপেক্ষা করেছিল। হায়! এখন যখন শনি নেমেই গেছে, পস্তায়ে আর কী হবে! যে গতিতে পতন হচ্ছে, যে ঠেকাতে আসবে, সেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ইনকিলাব জিন্দাবাদ!

দুই. মার্কিন ডিপস্টেটের সুশীল মুখোশ জর্জ সরোসের পোলা অ্যালেক্স সরোস এখন ঢাকায়, ছবিতে দেখেন, আমাদের মিষ্টি হাসির ইউনুসের সাথে কী দিল-খুলে হাসছে, দেখে প্রাণ জুড়ে যায়। আমাদের জেনারেশন পলাশির পুণরাবৃত্তি দেখবে, কে ভেবেছিল!

- Advertisement -

ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সরোসদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ভোটে জিতেছেন, বুঝতেই পারছেন মার্কিন জনগণ এবার ডিপস্টেটের একটা দফারফা না করেই ছাড়বে না। ডিপস্টেট মানে হচ্ছে অস্ত্র, মাদক, মানবপাচারসহ নানা লাভজনক ব্যবসা। বিশ্বের যেখানেই যুদ্ধ সেখানেই তারা, মানবপাচারের সবচে সহজ পথ যুদ্ধ। আর, মুনাফার টাকা দিয়ে তারা মুখ বন্ধ করে রাখে সুশীলসমাজ এবং সাংবাদিকদের। জর্জ সরোস তাদের গুরু।

বাংলাদেশে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা মাল ঢেলেছে, একটু খোঁজ নেন। আর ইউনুস যেহেতু ক্ষমতার লোভে এদের সাথে হাত মিলিয়েছে, এর ক্ষতি অনেকদূর গড়াবে তাতে সন্দেহ নাই। এদের বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত জাল, ট্রাম্পের পক্ষে আর কত জায়গায় সরোসদের কুপোকাত করা সম্ভব হবে? শেষে না নিজেরই পটল তুলতে হয়! সেই চেষ্টা যে থেমে গেছে তা কিন্তু না। ঢাকা এখন সরোসদের দখলে, পরের টার্গেট দিল্লি। অনেকটা পলাশির যুদ্ধের পরে বক্সারের যুদ্ধের মতো, বাংলার পতন না হলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তার বাণিজ্যের খোলসে ভারতবর্ষের দখল নিতে পারতো কিনা সন্দেহ। সাম্রাজ্যবাদীরা পুরোনো গল্পকে একটু এদিক-সেদিক করে লিখে থাকে। নতুন ধারার কলোনাইজেশনে তাই অনেক খোলস, বেশিরভাগ সময় টার্গেট দেশগুলোর মানুষই এই খোলসগুলোকে মুক্তির সোপান মেনে কাছে ডেকে আনে। বাংলাদেশের বেলায় তেমন একটা খোলস ছিল ইউনুসকে শান্তির দূত বানানো, যেমনটা করা হয়েছিল সুকির বেলায়।

বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা হারিয়েছে জুলাই-এ, নবাব সিরাজ না হলেও বাহাদুর শাহ জাফরের ভাগ্য বরণ করে শেখ হাসিনা দেশান্তরি হয়েছে, সেই অনুমান করা যায়। কিন্তু, বাংলায় মীর কাসিম কে হতে যাচ্ছে? কেউ কি আছে যে এই মহাবিপদে মীর কাসিমের মতো দিল্লির পাশে দাঁড়াবে?

 

তিন. প্রবাসে বাংলাদেশ শব্দটাই নস্টালজিক; সেখানে বাড়তি হিসেবে যদি ‘রাজশাহী’ শব্দটিও উচ্চারিত হয়, তো নস্টালজিয়া ভিন্নমাত্রা লাভ করে, তাতে সন্দেহ নাই। কারণ আর কিছুই না, আমাদের গ্রাজুয়েশন করার সেই যৌবন-দীপ্ত সময়। মানুষ বোধকরি তার শৈশবের পরে এই সময়টিকেই বেশি মনে রাখে। হরমোনাল পরিবর্তনের ঠেলা সামলে ওঠে কিছুটা স্থিতিশীল হওয়া, এর-ওর দিকে আরো গভীরভাবে তাকানো, আনমনা হয়ে যাওয়ার সূচনাকাল তো তখনই। কবিতা ও গান, সাথে জুটে যায় এক ঝাঁক বন্ধু এবং বান্ধবী, তো সেই স্মৃতি চিরকাল জেগে থাকতে বাধ্য। তাই সেই সময়ে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেলেই আমরা লুফে নিই, ভুলে যাই মাঝে কত যুগ পাড় হয়ে গেছে, আমাদের বাচ্চারাও বড় হয়ে আমাদের সেই ফেলে আসা সময়কে অতিক্রম করে গেছে।

যে শহরে থাকি, সেখানে এতদিন রাজশাহী শব্দটি উচ্চারিত হতো রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। গ্রীষ্মে ও শীতে–দু’বার ঘটা করে আমরা নিজেদের নস্টালজিক চরিত্রের প্রকাশ ঘটিয়ে আসছি বহুবছর ধরে। গত ৩ বছর থেকে শুরু হয়েছে রাজশাহী জেলার নামে পিকনিক। পুরোনো জেলা ভাগ হয়ে গেছে কতদিন হলো, কিন্তু, প্রবাসে এখনো বৃহত্তর শব্দের আড়ালে সেই জেলার মানুষগুলো একত্রিত হচ্ছে, সেও সেই নস্টালজিয়ার টানেই। তো গতকাল যাত্রা শুরু করলো আরেক সংগঠন: রাজশাহী ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অব আলবার্টা, সংক্ষেপে রুআআআ (RUAAA)। আমার মতো অনেকেই হাজির হয়েছে ওদের জামাই হবার বিরল সৌভাগ্যের বদৌলতে। ক্যালগারি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. আনিসের উপস্থাপনায় এবং একঝাঁক উদ্যোগী আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাদের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যের শুভেচ্ছা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে, ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগগতির ভেলায় ভেসে। তারপর একে একে তাদের বাইলজ পাশ হলো, নতুন কমিটি হলো, কতকিছু। তারপর নস্টালজিক স্মৃতিচারণে একে একে অনেক পৌঁছে গেল মতিহারের সেই সবুজ গন্ধে, কার জীবনে কীভাবে প্রেম এসেছিল, আনমনা হয়ে সকলেই শুনে গেল সেসব কথা।

রাজশাহী শব্দটিকে নতুন করে হাজির করার জন্য রিওসার একজন সদস্য হিসেবে রুআআআকে ধন্যবাদ জানচ্ছি, সেই সাথে কামনা করছি তাদের সফলতা।

 

ক্যালগেরি, আলবার্টা

- Advertisement -

Read More

Recent