
নাতাশার হাত থেকে হঠাৎ করে বইটা মেঝেতে পড়ে গেল।
“আবার কী হলো? কোনো সমস্যা?” ডাক্তার সাহেব ঘাড় নুইয়ে বইটা নাতাশার হাতে তুলে দিলেন।
কয়েক মুহূর্ত সময় পেয়ে নাতাশা ধাক্কাটা অল্প একটু সামলে নিয়ে বললো, “আপনার আম্মুর জন্মদিনে আপনি বইয়ের ইউজড কপি গিফট করবেন?” যদিও সে কখনো কোনো ক্রেতার সাথে তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলে না।
ডাক্তার তাড়াতাড়ি বলে উঠলো, “ছি! ছি! আপনি যেমনটা ভাবছেন, বিষয়টা আসলে তা না। আমার আম্মু সবকিছুতেই গল্প খুঁজে বেড়ান। এমনকি বই পড়ার সময়ও তার বই নিয়ে গল্প চাই। তিনি মনে করেন নতুন বইয়ের ভেতর কোনো গল্প থাকে না। গল্প থাকে অন্যের ব্যবহৃত বইয়ে। বই হাতে নিয়ে তিনি প্রথমেই বইটার ভ্রমণ ইতিহাস অনুমান করতে ভালোবাসেন। তিনি সেইসব গল্প খুঁজে বেড়াতে বা কল্পনা করতে পছন্দ করেন। তিনি বই হাতে নিয়ে কল্পনা করতে পছন্দ করেন, এই বইটা এর আগে কার কাছে ছিল। তিনি পুরুষ না মহিলা ছিলেন, তিনি বইটা কিনে পড়েছিলেন, নাকি উপহার পেয়ে ফেলে রেখেছিলেন। এইসব হাবিজাবি বিষয় কল্পনা করতে তিনি খুব পছন্দ করেন।”
“ও মা! উনি দেখি আমার দাদুর মতো!”
যখনই কোনো বইয়ের শিপমেন্ট আসতো নাতাশার দাদু নাকের সামনে বই নিয়ে বুক ভরে তার গন্ধ নিতেন। তিনি বলতেন, একেক প্রকাশনির বইয়ে নাকি একেক রকমের ঘ্রাণ। বইয়ের ভ্রমণের উপর নির্ভর করেও নাকি আবার বইয়ের গন্ধ পাল্টে যায়। দাদু বইয়ের গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারতেন কোন বইটার আগের মালিক একজন চেইন-স্মোকার। তিনিও বলতে পারতেন কোনো বইয়ের মালিক মেয়েমানুষ আর কোন বইয়ের মালিক পুরুষ ছিলেন। বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠার হাতের লেখা দেখেও তিনি অনেক কিছু কল্পনা করতে পারতেন। হাতের লেখা দেখে মাঝে মাঝে নাতাশাও অনেক কিছু বলে দিতে পারে। কিন্তু বইয়ের গন্ধ শুঁকে বইয়ের ইতিহাস বলার কৌশল আজও আয়ত্ত্ব করতে পারেনি।
“আমি কি আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?”
ডাক্তার সাহেব নিজের জন্য বইটা নিচ্ছেন না জানার পর তার সাথে আড্ডা চালিয়ে যাবার ইচ্ছে নাতাশার একদম করছে না। তবু এমন প্রশ্নের উত্তরে না বলা যায় না। তাই সে হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে বললো, “জি, করুন।”
“আচ্ছা… এইচডি মানে কী?”
তার মুখে এ প্রশ্নটা নাতাশা একদম আশা করেনি। “এইচডি?” সে ঠোঁট উল্টালো।
“হুম, এইচডি। আমি যখন এখানে আসি তখন আপনার পাশে বসা মেয়েটা এই শব্দটাই উচ্চারণ করলো বলে মনে হলো।”
নাতাশার এই মুহূর্তে রুবিকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করছে! “উমম.. এইচডি? ওহ! ওটা কিছু না। এইচডি দিয়ে সে আপনাকে বুঝায়নি। এইচডি মানে হলো… হাই ডেফিনিশন।”
“হাই ডেফিনেশন? কোন জিনিসটা হাই ডেফিনিশন জানতে পারি? ”
“টেলিভিশন।” নাতাশা বুঝতে পারলো এই ডাক্তার ভদ্রলোকটা নাছোড়বান্দা। “আমি ভাবছিলাম হাই ডেফিনিশনের একটা টেলিভিশন কিনবো। ওটার কথাই বলছিল ও।”
“ওহ আচ্ছা। এতক্ষণে বুঝলাম।” ডাক্তার সাহেব হেসে উঠলেন। “গত বছর আমিও একটা হাই ডেফিনিশন টিভি কিনেছিলাম। পিকচারটা খুব ক্লিয়ার।”
যাক, নাতাশা বিব্রতকর একটা প্রশ্ন খুব সহজেই কাভার করতে পারলো ভেবে নিজেকে নিয়ে গর্ব বোধ করলো। এতকাল জেনে এসেছে সে এতটা উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ না।
“ঠিক আছে তাহলে আমি এই বইটাই নিচ্ছি, মিস…”? নিজের হাতের বইটার দিকে ডাক্তার সাহেব ইশারা করলেন।
“নাতাশা। আমার নাম নাতাশা।”
“আমি রাহেল। ড. রাহেল।”
নাতাশা বুঝতে পারছে না কেন তারা তাদের নাম একে অপরকে জানাচ্ছে। সে নিশ্চিত এই লোক বইটা কিনে চলে যাবে। তারপর আর আসবে না। খুব বেশি বইপোকা না হলে কেউই দ্বিতীয়বার তার দোকানে আসে না। আর এই ডাক্তার তো মনে হয় কোনো দিন একটা গল্পের বইও হাতে নিয়ে দেখেনি।
নাতাশা কাউন্টারে ফিরে গিয়ে ক্যাশ রেজিস্টারটা বের করলো। আজ সারাটা দিনে এই প্রথম সে রেজিস্টারটা হাতে নিলো। নাতাশা আসলেই জানে না আর কতদিন এই ব্যবসাটা চালিয়ে নিতে পারবে।
রাহেল মানিব্যাগ থেকে পঞ্চাশ টাকা বের করে নাতাশার হাতে দিলো। টাকা হাতবদল হবার সময় রাহেলের বুড়ো আঙুলের ছোঁয়া নাতাশার হাতে লাগলো। সাথে সাথে নাতাশার পুরোটা শরীর শিহরিত হয়ে উঠলো। নাতাশা অবাক হয়ে গেল। কোনো ছেলের হাতের স্পর্শে তার এমন অনুভূতি কখনো হয় না।
“বাহ! বুকমার্কগুলো দারুন তো!” রাহেলের কথা শুনে নাতাশার শিহরিত হবার অনুভূতিটা মিইয়ে গেল। তার মনে হলো হয়তো ডাক্তার সাহেবের কাছে এক-দুইটা বুকমার্ক বিক্রি করা যাবে। “এগুলো হাতের তৈরি।”
রাহেল তার ভ্রু নাচালো। “ওয়াও! এগুলো আপনি বানিয়েছেন? সো ওয়ান্ডারফুল। আপনি তো দেখছি ভীষণ ট্যালেন্টেড!”
“না, না, এগুলো আমি বানাইনি।” নাতাশা স্বীকার করলো। “ রুবি বানিয়েছে।” সে পাশে বই পড়তে থাকা রুবির দিকে ইশারা করলো।
রুবি বই থেকে তার চোখ তুলে ডাক্তারের দিকে তাকালো তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠলো, “আরে! , হট ডক্টর যে!’
নাতাশার কপালে ভাঁজ পড়লো। দুটো কান দিয়ে তার গরম বাতাস বের হওয়া শুরু হলো।
হাতের বইটা টেবিলের উপর রাখতে রাখতে রুবি ডাক্তার সাহেবকে বললো, “এইচডি মানে হট ডক্টর। আমরা দু’জন আপনাকে এইচডি বলে ডাকি।” রুবি খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে কথাগুলো বললো যেন সে ডাক্তারকে বইয়ের লাভ-লসের হিসেব বুঝিয়ে বলছে।
নাতাশা জানে যে রুবি খুব ঠোঁটকাটা স্বভাবের কিন্তু তাদের মধ্যকার এই গোপন বিষয়টা এভাবে প্রকাশ করে দেবে তা বুঝতে পারেনি। “বাহ আমার কথা শুনে দেখি ডাক্তার সাহেব ঘেমে যাচ্ছেন! হি হি হি।” কেউ কোনো কথা না বলছে দেখে নাতাশা হেসে উঠলো।
রাহেল সত্যি সত্যি লজ্জা পাচ্ছিল। সে ভাবতেই পারেনি তাকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। তবে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে স্বাভাবিক হয়ে গেল। “আমার বরং মনে হচ্ছে আপনার এই কলিগটাভনার্ভাস হয়ে পড়েছেন।” সে নাতাশার দিকে ইংগিত করলো।
“আরে না তো ডাক্তার সাহেব। ও সবসময়ই এমন। তবে আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আপনার সাথে না আমার এই বান্ধবীটাকে যথেষ্ট মানাবে।”
নাতাশা নিজের পায়ের দুটো বুড়ো আঙুলের দিকে তকিয়ে থেকে মনে মনে বলতে থাকলো, ধরণী দ্বিধা হও। তবে এই অবস্থাটা তার ভালোও লাগছে, আবার লজ্জাও পাচ্ছে।
“আপনি বললেই তো হবে না। আপনার বান্ধবীর কী মতামত সেটা জানুন।”
রুবি ভাবেনি ডাক্তার সাহেব ব্যাপারটাকে এত পজিটিভলি নিয়ে নেবেন। বন্ধুদের জন্য ঘটকালী সে অনেক করেছে, কিন্তু তাতে এত সহজে সফলতা খুব কমই এসেছে। “ও আর কী বলবে? দেখছেন না, ও চুপচাপ হয়ে আছে। নীরবতাই সম্মতির লক্ষণ- এটা কি আপনাকে বুঝিয়ে বলতে হবে শুনি?” রুবি ড. রাহেলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন-সূচক দৃষ্টি নিয়ে তাকালো।
নাতাশারও তখন মনে হলো, দেখা যাক না প্রেম করে। ডাক্তার সাহেব বই না পড়ুক, মানুষ হিসেবে তো ভালো বলেই মনে হচ্ছে। তার দেখা সব ডাক্তারই সমাজে প্রতিষ্ঠিত। টাকা-পয়সাও অনেক তাদের। আর তাছাড়া মফস্বল শহরে থাকা বাবা-মাও মেয়ে জামাই হিসেবে কোনো ডাক্তার পেলে খুশি হবেন। চাল নেই চুলো নেই এমন কারো সাথে প্রেম করার পর বিয়ের সময় বাবা-মার অনুমতি পেতে সমস্যা হয়। ডাক্তার হলে সমস্যা হয় না। রুবি বাবা-মার কথা মেনে চলা মেয়ে। যার-তার সাথে প্রেম করে পরে বিয়ে করার সময় বাবা-মাকে কষ্ট দিতে সে মোটেও চায় না। তাই প্রেম যদি করতে হয় তাহলে একজন ডাক্তারের সাথে প্রেম করাটাই তার কাছে নিরাপদ বলে মনে হলো।
আসছে …অধ্যায় ২: প্রাক্তন
রাহেলের সাথে ব্রেক-আপ হবার পর থেকে আমার না একটা নেশা হয়ে গেছে। সেটা হলো নিজের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করা। রাহেল পছন্দ করতো না বলে রাহেল থাকতে কখনোই ফেসবুকে নিজের ছবি পোস্ট করতাম না। ব্যাপারটা রাহেল পছন্দ করতো না। এখন যেহেতু রাহেল নেই এমন নেশায় বুঁদ হয়ে থাকলেও কোনো সমস্যা নেই। আর ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, রাহেল আমার সাথে ব্রেক আপ করলেও ফেসবুক থেকে আমাকে আনফ্রেন্ড করেনি। তার মানে, ফেসবুকে ছবি পোস্ট করলে নিশ্চয়ই সে আমার ছবিটা দেখতে পায়। আমি জানি না, ছবিগুলো দেখে রাহেলের মনে অনুশোচনার সৃষ্টি হবে কি না। আমি একদম জানি না, সে কী হারালো সেটা তখন সে বুঝতে পারবে কি না। আমি এও জানি না, হারিয়ে যাওয়া মানুষটাকে সে ফিরে পেতে চাইবে কি না। তবু আমি চেষ্টা করি ছবি তোলার সময় যথেষ্ট সাজগোজ করে আমার বেস্ট লুকটা নিয়ে আসতে। এই যেমন লাস্ট যে ছবিটা ফেসবুকে পোস্ট করেছিলাম সেটা চূড়ান্ত করতে আমার তেত্রিশটা স্ন্যাপ নিতে হয়েছিল। আর খুশির খবর হলো, ছবিটাতে যে ছাব্বিশটা লাইক পড়েছিল তার একটা ছিল ড. রাহেল আহমেদের!
আমি জানি, ব্যাপারটা খুব অস্বাভাবিক। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত না রাহেলের ফেসবুক স্ট্যাটসটা সিঙ্গেল থেকে ইন অ্যা রিলেশনশিপে যাবে ততদিন পর্যন্ত আমি রাহেলকে ফিরে পাবার চেষ্টা চালিয়ে যাবো। এছাড়া যে আমার আর কোনো উপায়ও নেই। (আসছে খুব শিগগির!)
