
আগের রাতে ভালো ঘুম হয়নি। ভোর রাত অব্দি আড্ডা। কথা সাহিত্যিক সাদ কামালীর ফ্লেমিংডন পার্কের এপার্টমেন্টে। মধ্যরাত পর্যন্ত রবীন্দ্র সুরের ধারায় মাতিয়ে রেখেছিলেন টরন্টোর বরেণ্য শিল্পী নাহিদ কবির কাকলী। ঘুমোতে যাবার আগেও গুন গুনিয়ে গাইছিলাম কবিগুরুর “আমার নিশিত রাতের বাদল ধারা….।”
রাতে বৃষ্টি হয়নি। ঘুম ভাঙ্গতেই দেখি ঝকঝকে রোদ। ভালোই হলো। কানাডায় নতুন অভিবাসন। সিএন টাওয়ার দেখা হয়নি। নিজের ড্রাইভিং লাইসেন্স হয়নি তখনো। সাবওয়ে ট্রেনে সিএন টাওয়ার দেখতে যাবো। পাতাল রেলে চড়ার উত্তেজনায় রোবাব রাতে ঘুমোয়নি! সাড়ে চার বছর বয়সি ছেলে রোবাব। সবে কিন্ডারকার্টেনের জুনিয়র সেকশনে যাতায়াত শুরু করেছে।
মিনিটে মিনিটে ছেড়ে যাওয়া পাতাল রেলের একটিতে চড়ে বসলাম। একেবারে সামনের বগিতে। ড্রাইভার সাহেব কোথায় বসেন দেখিনি। বগির ফ্রন্ট উইন্ডশিল্ড স্বচ্ছ কাঁচ। বাপছেলে অন্ধকার টানেলে ট্রেনের হেডলাইটে দেখা সমান্তরাল লাইনের কার্ভেচার উপভোগ করছিলাম। বেশ ভালোই আঁকাবাঁকা টরন্টোর পাতাল পথ।
ইউনিয়ন স্টেশনে যখন পৌঁছাই তখন গুড মর্ণিং বলার টাইম পেরিয়ে গেছে। ইউনিয়ন স্টেশন হলো টরন্টোর কিংস ক্রস। লন্ডনের কিংস ক্রস স্টেশনের মতো কানাডার প্রধান রেলওয়ে হাব।
বিশাল স্টেশনে নেমে অথৈ জলে পড়লাম। তাও মাটি থেকে বিশ মিটার নীচে! ইষ্টিশনের জানালা দিয়ে সিএন টাওয়ার খুঁজবো সে উপায় নাই। পাতাল থেকে ভূতলে বেরিয়েছিলাম কোন গেট দিয়ে, শত চেষ্টায় আজো মনে করতে পারিনা। কেবল মনে আছে, অসংখ্য গেটের কোনো একটি পার হয়ে এক ঠ্যাং মেলে দাঁড়িয়ে থাকা অতিকায় উঁচু এক মিনার। যার গোড়ায় দাঁড়িয়ে মাথা নব্বুই ডিগ্রী এঙ্গেলে আনুভূমিক থেকে উল্লম্ব করতে হয়েছিলো।
নির্মাণ গল্প বলতে এসে ভ্রমন কাহিনী শুরু করলাম। ধান ভানতে শিবের গীতের গাওয়া আর কি! সিএন টাওয়ার যাঁরা ভ্রমন করেছেন তাঁদের সবার নিজস্ব গীত রয়েছে। পরিবার সমেত বেড়াবার আনন্দময় গল্প রয়েছে। কষ্ট করে আমারটা শোনার দরকার আছে বলে মনে হয়না। বরং এর নির্মাণ ইতিহাস বেশ ইন্টারেস্টিং লাগতে পারে।
সিএন টাওয়ার ভ্রমনকারী বেশির ভাগ মানুষের জানা নেই সিএন টাওয়ার কেনো নির্মিত হয়েছিলো। সে বেশ মজার কাহিনী। বিশ্বে উচ্চতম টাওয়ার বা ভবনের কৃতিত্ত্ব নেয়ার ইচ্ছা কানাডার কখনোই ছিলোনা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকে কানাডা শনৈ শনৈ উন্নতি লাভ করে। সারাদেশে বিপুল নির্মাণ যজ্ঞ শুরু হয়। পাতাল রেল (মেট্রো), হাইওয়ে, বহুতল ভবন, আলীশান হাইওয়েজ ইত্যাদি মন্ট্রিয়ল, টরন্টো ও ভ্যানকুভার নগরীকে বিশ্বে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়। মাল পরিবহনে বিশাল কানাডাকে যুক্ত করতে রেল পরিবহন দারুন জনপ্রিয়তা পায়। এই সময় সিএন রেল বা কানাডিয়ান ন্যাশনাল রেল ডিপার্টমেন্ট সারাদেশে ট্রেন চলাচল নির্বিঘ্ন এবং নিরাপদ করতে সিগন্যাল সিস্টেম উন্নত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ষাট দশকের মাঝামাঝি সিএন রেল ‘ইউনিয়ন স্টেশন’ এলাকায় বিশাল সিগন্যাল টাওয়ার নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দেয়। কানাডা ল্যান্ডস কোম্পানি তখন এই জমির মালিক। এদের মালিকাধীনেই সিএন টাওয়ার নির্মাণের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৬৮ সালে স্থপতি নির্বাচন করা হয়। ডব্লিউ.জেড.এম.এইচ আর্কিটেক্টস নামক একটি প্রতিষ্ঠান এর স্থাপত্য নকশা নির্মাণের দায়িত্ত্ব পায়।
৫৫৩ মিটার বা ১৮১৫ ফুট উচ্চতা নিয়ে সিএন টাওয়ার টরন্টোর স্কাইলাইনের সর্বোচ্চ সীমা রেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে। ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ার, ইংল্যান্ডের বিগ বেন ক্লক টাওয়ার কিংবা অস্ট্রেলিয়ার সিডনি অপেরা হাউজের মতোই কানাডার প্রতিনিধিত্ত্ব করে সিএন টাওয়ার। ২০০৭ সাল পর্যন্ত এটিই ছিলো বিশ্বের উচ্চতম ফ্রি স্ট্যান্ডিং স্ট্রাকচার।
ফ্লোর বা তলার হিসাব অনুযায়ী এটি ১৪৭ তলা উচ্চতা বিশিষ্ট টাওয়ার। দুবাইয়ের বুর্জ খলিফাসহ মধ্যপ্রাচ্য ও চীনে বিশাল উচ্চতার ফ্রি স্ট্যান্ডিং স্ট্রাকচার হবার পর সিএন টাওয়ারের অবস্থান এখন নবম। তবে উচ্চতার বিচারেতো স্থাপনার মর্যাদা নির্ধারিত হয়না। হয় রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক মানদন্ড, ইতিহাস ও ঐতিহ্য দিয়ে। আইফেল টাওয়ার অথবা স্ট্যাচু অব লিবার্টি তাঁর প্রমান।
সবগুলো টাওয়ার ছাপিয়ে সিএন টাওয়ার বিখ্যাত হয়েছে এর নির্মাণ পদ্ধতির কারণে। অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া এবং দুই বছরের অধিক সময় ধরে সিএন টাওয়ারের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর চেয়েও অধিক সময় লেগেছে এর জটিল ইঞ্জিনিয়ারিং নকশা প্রস্তুত করতে। ১৯৬৮ সাল থেকে শুরু করে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত কেবল বিভিন্ন নকশা তৈরী করা হয়েছে।
স্থাপত্য নকশায় জটিলতা না থাকলেও একক ফ্রি স্ট্যান্ডিং উচ্চতার প্রকৌশল নকশা (স্ট্রাকচারাল ড্রয়িং) প্রণয়নে সুকঠিন লগারিদম ব্যবহৃত হয়েছে। সেসময় জটিল ক্যালকুলেশনের জন্য সফটওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ ছিলোনা। মাটির ধারণ ক্ষমতা নির্ধারণ করা ছিলো কঠিন। তবু ফাউন্ডেশন ইঞ্জিনিয়ার অধ্যাপক এলি রোবিনস্কি মাটির অনেক গভীর পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করে ‘শেল’ ভেদ করে বিশাল উচ্চতার টাওয়ারের এক লক্ষ ত্রিশ হাজার টন ওজনের ভার বহন যোগ্য ভিত্তি নির্ধারণ করলেন।
স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ড. ফ্রাঞ্জ ক্রোল এবং আর.আর. নিকোলেট মিলে কংক্রিটের সর্বমোট ওজন, ভূমিকম্পের মাত্রা, বায়ুচাপ ইত্যাদি সহ সকল রকম লোড হিসাব কষে এর কাঠামো নির্ধারণ করলেন। স্থপতি জন এন্ড্রু এবং রজার ডু টয়েটের স্থাপত্য নকশার কোনো পরিবর্তন ছাড়াই সিএন টাওয়ারের নির্মাণ নকশা তৈরী করে ফেললেন।
কিন্তু স্থপতি এবং প্রকৌশলীদের চেয়েও দুরূহ কাজটি করতে হলো ঠিকাদারি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে। কেননা এতো উঁচু টাওয়ারে নির্মাণ সামগ্রী পৌঁছানো বিরাট চ্যালেঞ্জ। সুইডিশ কনস্ট্রাকশন কোম্পানি স্ক্যান্সকা তাদের কানাডিয়ান সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান ‘কানাডা সিমেন্ট কোম্পানি’র মাধ্যমে এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে। নির্মাণে হেলিকপ্টার ক্রেন ব্যবহার করা হয় কনস্ট্রাকশন ম্যাটেরিয়াল উপরে নেবার জন্য।
নির্মাণ শুরু হয় ফেব্রুয়ারী ৬, ১৯৭৩। শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ৪০ মাস। তবে ব্যবহারের জন্য এটি খুলে দেয়া হয় অক্টোবর ১, ১৯৭৬। নির্মাণ ব্যয় মাত্র ৬৩ মিলিয়ন ডলার। আজকের বাজারে মাত্র মনে হলেও তখনকার সময়ের ব্যববহুল প্রকল্প এটি।
বাইরে থেকে মনোলিথিক ট্রাইপড কংক্রিট স্ট্রাকচার মনে হলেও পিলারগুলোর মাঝে কোর রয়েছে। এই কোরে এলিভেটর এবং সিঁড়ি বসানো রয়েছে। ৩৫১ মিটার উচ্চতায় গোলাকার স্ল্যাব ডিজাইন করা হয়েছে। এখানেই শুরু অবজারভেশন ডেক। রয়েছে সুদৃশ্য সুস্বাদু রেস্টুরেন্ট। ১১৬ তলা ডেকের উপর অবস্থিত রেস্টুরেন্টটি প্রতি ৭২ মিনিটে একবার নিজের পূর্ণ অক্ষ অর্থাৎ ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে আসে। রেস্টুরেন্টের নাম তাই “৩৬০ দ্য রেস্টুরেন্ট এট দ্য সিএন টাওয়ার।” রিভলভিং রেস্টুরেন্ট হিসাবে এটি অনেকদিন বিশ্বের উচ্চতম ছিলো।
৪৪৭ মিটার উচ্চতায় নির্মাণ করা হয়েছে স্কাইপড। একসময় বিশ্বের উচ্চতম দাঁড়াবার স্থান ছিলো সিএন টাওয়ার স্কাইপড। সাহসী অভিযানকারী স্কাইপড থেকে প্যারাস্যুট নিয়ে ঝাঁপ দেবার দুঃসাহস দেখায়। পিঠে হার্নেস বেঁধে এইজওয়াক (Edgewalk) করে। দেড় হাজার ফুট উঁচু খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে শারীরিক কসরৎ দেখায়। ভয়ঙ্কর সে দৃশ্য! হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে তাঁদের খেলা দেখে। টাওয়ারটি বর্তমানে প্রধান সকল ব্রডকাস্ট মিডিয়া (নন স্যাটেলাইট), এএম, এফএম, ডিএবি রেডিও এবং অন্যান্য ওয়্যারলেস সার্ভিস প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করছে।
পনেরো লক্ষ ট্যুরিস্ট সাগর মহাসাগর পেরিয়ে প্রতি বছর সিএন টাওয়ার দেখতে বেড়াতে আসে। বোনাস হিসাবে ভুড়িভোজনের দারুণ সুযোগ! খেতে খেতে গোটা টরন্টো আর লেক অন্টারিওর শান্ত জল ঘুরে দেখা। না… নিজের ঘাড় ঘুরাবার প্রয়োজন নেই। ১১৬ তলার রেস্টুরেন্ট নিজেই ৩৬০ ডিগ্রী কোণে পুরো শহর ঘুরিয়ে আনবে।
টরন্টো, কানাডা
