ক্যাপ্টেন শরীফ

পড়াশুনা করেছি বরাবরই পাবলিক স্কুলে চার পাঁচ ছয় টাকার উপরে বেতন দিয়েছি বলে মনে পড়েনা

‘হেড স্যারের ঘরে বেত ঝুলানো আছে। যা একজোড়া বেত নিয়া আয়।’

ড্রয়িং স্যারের চোখ লাল হয়ে আছে। রাগে গজগজ করছেন। ক্লাশ ক্যাপ্টেন শরীফের কচি মুখটা চুপসে গেছে। ড্রয়িং পেন্সিল সেও আনে নাই। বেত্রাঘাতের পয়লা দাগটা ওর পশ্চাতে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি।

- Advertisement -

বেত দিয়ে শিল্প হলেও বেতের প্যাঁদানিতে কি শিল্পী বানানো যায়? শিল্পী হওয়াটা মানুষের সৃজনশীল সুকুমার চর্চার ফল। পিটিয়ে শিল্পী হয়না। কিন্তু স্যার নাছোড় বান্দা। আমাদের গগা, দ্য ভিঞ্চি, ভ্যানগগ, পিকাসো বানিয়েই ছাড়বেন।

পড়াশুনা করেছি বরাবরই পাবলিক স্কুলে। চার, পাঁচ, ছয় টাকার উপরে বেতন দিয়েছি বলে মনে পড়েনা। এই বেতনে একাডেমিক পড়াশুনা, স্পোর্টস, শিল্পচর্চা, লিডারশিপ, বিজ্ঞান ক্লাব অল ইনক্লুসিভ। টাইট বাজেটে এক্সক্লুসিভ এ্যাক্টিভিটিজ করা মানে প্রচন্ড খরার মাঝে দু’একটা বৃষ্টির ফোটা! এক দুই বছরে দুই একখান শিক্ষা সফর। তাও আবার বাড়ির পাশের বিজ্ঞান জাদুঘর, শাহবাগের জাতীয়

জাদুঘর কিংবা সর্বোচ্চ মিরপুর চিড়িয়াখানা পর্যন্ত।

কিন্তু সে যাই হোক, শিল্পী আমাদের হতেই হবে। ড্রয়িং স্যারের একদফা এক দাবী, ছাত্ররা সব শিল্পী হবি। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা আমাদের সৃষ্টির সময় কেবল মুখস্থ বিদ্যা দিয়ে পাঠিয়েছেন। বাংলা, ইংরেজি, ইসলামিয়াত, সবই করি মুখস্থ। তারপর সময়মতো উগরিয়ে পরীক্ষার খাতাস্থ। কিন্তু ড্রইংতো মুখস্থ করা যায়না। তাই আমাদের ক্ষুরধার সৃজনশীল(!) বিদ্যেয় আর কুলোয়না।

অতএব ক্লাশের সকলে মিলিয়া একদা শুভক্ষণ দেখিয়া ড্রয়িং ক্লাশকে গণ তালাক প্রদান করিলাম। শুভক্ষণে নেয়া সিদ্ধান্ত শুভ হইলোনা। মঙ্গলবার স্যার যথারীতি পঞ্চম পিরিয়ডে ক্লাশে ঢুকিলেন। চক ডাস্টার হাতে লইয়া সাঁই সাঁই করিয়া ব্ল্যাকবোর্ডে এক মুহূর্তে গ্রামবাংলার একখানা ছবি আঁকিলেন। অতপরঃ আমাদিগকে কহিলেন ইহা দেখিয়া বাংলার মুখ আঁকিতে হইবেক।

সঙ্গে সঙ্গে স্যার এটাও জানালেন, হুবহু এমন না হলেও চলবে। বললেন, পুকুরে আমি দুইটা হাঁস আঁকছি। তোরা চাইলে তিন চাইরটা হাঁস আঁকতে পারোস। তাই বলে মাথার উপর আবার সূর্য দুইটা আঁকিস না।

হালকা হাসির রোল উঠলো একথায়। স্যারের কানে যাওয়া মাত্রই গর্জে উঠলেন।

“এই হাসলো কে রে? বল, হাসছে কে?”

গণতালাকে স্বাক্ষর করা সকল ছাত্র ন্যূনতম কর্মসূচীর ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ। কেউ কথা বলছিনা। পুরো ক্লাশ চুপ।

বল, কে হাসছে?

পিনপতন নীরবতা। যেনো এক মিনিটের শোক পালিত হচ্ছে। কেউ মুখ খোলা দূরে থাক, নড়াচড়াও করছে না।

স্যার নিজেই হার মানলেন। ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়লেন। বললেন, ঠিক আছে এখন আঁকা শুরু কর।আমরা আঁকতে শুরু করলাম।

ক্লাশে উপস্থিত সকল মাইকেল এঞ্জেলোর হাতে রঙতুলির বদলে উইংসাং ফাউন্টেইন পেন। এমনকি পেন্সিলও নিয়ে আসিনি কেউ। উইংসাং কলম দিয়েই এঁকে চলছি বাংলার মুখ।

কারো হাতে পেন্সিল নেই এটি যেনো নজরেই পড়লো না। কিংবা নজরে পড়লেও স্যারের মগজে ঢুকলোনা। যখন ঢুকলো তখন মগজের তাপমাত্রা গলনাঙ্ক ছেড়ে স্ফুটনাঙ্কে পৌঁছে গেছে। ব্যাঘ্র হুংকার ছেড়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। রাগে চক্ষু লাল। চোখের লাল দুটো মনি লালমনিরহাট থেকে এখুনি মিসাইলের মতো ঢাকায় পতিত হবে।

ক্লাশ ক্যাপ্টেন শরীফের দিকে সুন্দরবনীয় বাঘের কটমটে দৃষ্টিতে তাকালেন।

এক্ষুনি যা। যাচ্ছিস না কেনো?

কোথায় যাবো স্যার?

হারামজাদা। বললাম না? হেড স্যারের রুমে ঝুলানো আছে। জোড়া বেত আনবি।

কাঁচুমাঁচু হয়ে শরীফ চুপচাপ বেরিয়ে যায়। স্যারের শ্বাসপ্রশ্বাস গাঢ় হতে থাকে। আবার হুংকার ছাড়েন। সিংহের গর্জনে বলতে থাকেন,

“কলম দিয়ে এঁকে ওনারা জয়নুল আবেদীন হবেন? বেত আসুক। পাছার ছাল তুলে ফেলবো আজ।“

পিনপতন নীরবতা ক্লাশে। স্যার বাদে কারো নিঃশ্বাসের আওয়াজ নেই। দু’ মিনিট, তিন মিনিট, পাঁচ মিনিট…। স্যারের রক্তচক্ষু আগুনচক্ষু হয়। শরীফ ফিরে আসেনা।

ধৈর্যের বাঁধ বুঝি ভাঙন থেকে আর বাঁচলোনা। সেকেন্ড ক্যাপ্টেন তুহিনের দিকে তাকালেন।

দুই মিনিটের পথ। সাত মিনিট গেছে। ঐ হারামির খবর নাই। তুই যাতো। কি হইছে দ্যাখ। দেরী করবি না।

তুহিন স্মার্ট বয়। বারান্দায় বেরিয়ে আবার ক্লাশে ঢুকে পড়ে।

“স্যার, হেড স্যারের রুম বন্ধ। সবাই মিটিং করে। শরীফ মনেহয় কমন রুমে গেছে বেত আনতে।”

“যেইখানেই যাক। বেতসহ ওরে ধইরা আন।”

তুহিন আবার বেরিয়ে যায়। এবারো তিন মিনিট, পাঁচ মিনিট, সাত মিনিট…. তুহিন লাপাত্তা।

স্যার খরগোসের মতো লাফিয়ে উঠলেন। আমি স্যার বরাবর সামনের ডেস্কে বসা। চক্ষুদ্বয় আগুনের গোলা বানিয়ে আমার দিকে তাকালেন। যেনো সব অপরাধ আমার। ধমকের সুরে বললেন,

এ্যই… তুই যাতো। শয়তান দুইটারে খুইজ্যা বাইর কর। কমন রুমে গেছে নাকি গার্লস স্কুলের সামনে দাঁড়ায়া ফিল্ডিং দিতাছে। বিশ মিনিটেও খবর নাই!

কোনো কথা ছাড়াই চুপচাপ উঠে দাঁড়ালাম। বারান্দায় এসে বুক ভরে নিশ্বাস নিলাম। আপাতত সিংহের খাঁচা থেকে বাঁচা গেছে। পরেরটা পরে বোঝা যাবে।

কমন রুমের সামনে ওদের পাবোনা জানতাম। তবু গেলাম। নেই। এবার হাঁটা দিলাম উত্তর দিকের বারান্দা বরাবর। সামনের বিশতলা আইডিবি ভবন তখনো ওঠেনি। পূবদিকে হালকা জঙ্গল। রাস্তার ওপারে তেজগাঁও এয়ারপোর্ট। এয়ারপোর্টের প্রথম অংশের পুরোটাই জঙ্গল। এরপর রানওয়ে। এয়ার ফোর্সের যুদ্ধ বিমান মাঝেমধ্যে বিকট শব্দে ওঠানামা করে।

ডানদিকে মোচড় নিয়ে স্কুলের পূব ওয়াল ঘেঁসে দক্ষিণে গেলাম। নতুন কাশ গজিয়েছে। কাশবনে সাদা ফুল ফোটেনি তখনো। পাশে আরো কিছু সবুজ লতাগুল্ম। অন্ধকার ঝোপঝাড়। কাঁটাওয়ালা ঝোপ।

সামনের একটা ঝোপ হঠাৎ নড়ে উঠলো। নড়া দেখে সন্দেহ হলো। উঁকি দিতেই হঠাৎ কে যেনো হাত টেনে ধরলো! গা শিরশির করে উঠলো। ভূত কিনা? না, ভূত নয়।

অদ্ভূদ হাসি দিয়ে ক্লাশ ক্যাপ্টেন শরীফ টেনে নিয়ে গেলো জঙ্গলে। ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে ফেললো আমাকে। ঢুকেই দেখি তুহিনের অনভ্যাস্ত ঠৌঁঠে ধরানো সিগারেট। স্টার সিগারেট। নাক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়া প্র্যাক্টিস করছে।

তুহিনের ঠৌঁঠ থেকে কেড়ে নিয়ে দুইবার টান দিলো ক্যাপ্টেন শরীফ। এবার আমার দিকে বাড়িয়ে বললো,

“এই খানে বইস্যা চুপচাপ বিড়ি খা। ঘন্টা পড়লে এক লগে ক্লাশে যামু।”

বললাম, আমি পারিনা দোস্তো। তিতা লাগে। মুখটাও তিতা হয়ে থাকে। বাড়িতে গিয়া ভাত খাইতে পারি না।

“তাইলে ফিডার আইনা দেই। ফিডার খা।”

‘দোস্তো ক্লাশে না গেলে কিয়ামত হয়্যা যাইবো। চল ক্লাশে যাই। স্যার বেতের জন্য বইসা আছে।’

“থাকতে দে। ঘন্টা পড়লে চইল্যা যাইবো। মামলা ডিসমিস। আগামী ক্লাশ এখনো এক সপ্তাহ। ঐদিন তিনজনেই ক্লাশে আমুনা। বুজছোস?”

ওর সদ্য শেখা ধোঁয়ার কুন্ডলী ছাড়া দেখতে দেখতে মাথা ঝাকালাম।

পরের মঙ্গলবারের ঘটনা। ক্লাশের তিন জন বালক পেটের পীড়া জনিত কারণে ক্লাশে উপস্থিত হতে পারেনি। তবে বিকেল তিনটে নাগাদ এদের একত্রে শ্যামলী সিনেমা হল থেকে বের হতে দেখা যায়। হলে তখন সিলভেস্টার স্ট্যালন অভিনীত ‘র‍্যাম্বো’ নামক ইংরেজি ছবি চলছিলো।

 

ব্রাম্পটন, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent