
তিরানব্বুইকি চুরানব্বুইর এক সকাল। আমি লেখার টেবিলে। খুব জরুরি একটা লেখা সেদিনই তৈরি করতে হবে। আমার পাঁচছয় বছর বয়েসী কন্যা নদী এসে একটু পর পর এটা সেটা জিজ্ঞেস করছে। একদম পিচ্চি থাকা অবস্থাতেই পুটুর পুটুর কথা বলতে শিখে গিয়েছিলো নদী, ওর মায়ের কল্যাণে। কথা বলতে না শেখা এইটুকুন একটা বাচ্চাকে কোলের মধ্যে রেখে ওর সঙ্গে সারাদিন কথা বলতো শার্লি। ছড়া শোনাতো রূপকথা শোতো আর বানিয়ে বানিয়ে এন্ডলেস ম্যারাথন একটা কাহিনি বলে যেতো শার্লি অক্লান্ত ভাবে। ফলে অন্য আর দশটা বাচ্চার চাইতে অনেক আগেই কথা বলা শিখে গিয়েছিলো নদী। কাবুলিওয়ালা গল্পের মিনির মতোই সারাক্ষণ কথা বলে বাড়িটা মাতিয়ে রাখতো মেয়েটা।
সেদিন আমার ব্যস্ততার কারণেই ওর প্রতি খানিকটা অবহেলাই প্রদর্শন করা হচ্ছিলো। কিন্তু তাতে একটুও দমে না গিয়ে আমার কাছে ওর পুন পুন আবির্ভাব ঘটতেই থাকে—বাবা এটা বাবা সেটা কতো কী! কোনো একটা জিনিস ওর লাগবে সেই বায়নাক্কা নিয়েই আমার কাছে ওর বারবার আসা। আমি লেখার দিকে মনোযোগী বলে ওর ঠিক কোন জিনিসটা লাগবে সেটা না বুঝেই শুধু কিনে দিতে হবে বাক্যটা বুঝতে পেরে ওকে নিরস্ত করতে কোনো কিছু চিন্তা না করেই মুখ ফসকে বলে ফেললাম—না, কিচ্ছু কেনা যাবে না, এমনিতেই তোর পেছনে অনেক খরচ।
আমার কাছে কখনোই এরকম সরাসরি না-সূচক কোনো বাক্য শুনে সে অভ্যস্ত নয়। ‘না’ শব্দটা ওর মা বলে কিন্তু আমি ওর সব কথাতেই হ্যাঁ বলি। সুতরাং আমার দিক থেকে ‘না’ শুনে নদী সম্ভবত জীবনে প্রথমবারের মতো হতভম্ব হলো। খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে এক বুক অভিমান নিয়ে মেয়েটা কখন চলে গেছে আমি টেরও পাইনি। মিনিটদুই পরে খুবই বেদনাকাতর একটা চেহারা নিয়ে আবারো এলো সে আমার কাছে—আচ্ছা বাবা আমার পেছনে এ পর্যন্ত কতো টাকা খরচ হয়েছে তোমার?
ওর প্রশ্নে অবাক হলাম আমি—কী বললি?
প্রশ্নটা রিপিট করলো নদী—আমার পেছনে এ পর্যন্ত কতো টাকা খরচ হয়েছে তোমার?
–কেনো রে? (আমি সত্যি সত্যি বিস্মিত)
–না। বলো। কতো টাকা খরচ হয়েছে?
মুহূর্তেই বুঝে গেলাম ভয়ানক একটা মিসটেক ইতোমধ্যেই আমি করে বসে আছি। প্রিয় বাবাটার কাছ থেকে এরকম কিছু শুনবার জন্যে তৈরি ছিলো না সে। একটা অকল্পনীয় অভাবনীয় কথা সে তার বাবার কাছ থেকে শুনেছে। শুনে মর্মাহত হয়েছে। রাজ্যের অভিমান এসে আছড়ে পড়েছে ওর ছোট্ট এইটুকুন হৃদয়ে। বুক ভাঙা বেদনা নিয়ে সে তার বাবার সামনে দাঁড়িয়েছে।
ব্যাপারটায় প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও এর অন্তরনিহিত মজাটা আমাকে পেয়ে বসলো। আমি ঘটনার শেষটুকুও দেখতে চাই। তাই ওর কথায় বেশ সিরিয়াস একটা ভঙ্গি চেহারায় এঁকে নিলাম তারপর আঙুলের কড়ায় হিশেব করতে শুরু করলাম—তোর জন্মের পরে হাসপাতালে ধর চল্লিশ টাকা, ঝুমঝুমি+পুতুল ধর পঁচিশ টাকা, দোলনাটা ছিলো ধর একশো টাকা, গত সপ্তাহে কন্টিনেন্টালে বিরিয়ানি খেতে ধর নব্বুই টাকা তারপর বলতে বলতে আড় চোখে তাকাই নদীর দিকে। নদী দেখলাম আমার চাইতেও সিরিয়াস ভঙ্গিতে আমার হিশেব করা দেখছে এবং শুনছে। সর্বমোট খরচরের অংকটা সে জানতে চায়। আঙুলের কড়ায় হিশেবটা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে বলে একটা কাগজে লিখে নিয়ে যোগ দিয়ে খরচের অংকটা অবশেষে বের করতে সক্ষম হলাম—জন্মের পর থেকে তোর পেছনে এই পর্যন্ত আমার খরচ হয়েছে মোট তিনশ সাতাত্তর টাকা।
‘ও আচ্ছা।’ বলে হনহন করে চলে গেলো সে। অনেক কষ্টে হাসি চেপে রাখতে রাখতে এদিকে আমার যাকে বলে একেবারে হালুয়া টাইট অবস্থা। লেখাটেখা বাদ দিয়ে আমি হাসছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফের নদীর আগমন ঘটলো। চেহারায় একটা পূর্ণ বয়স্ক নারীর অভিমান ঝুলিয়ে রেখে মুঠো করা ওর ছোট্ট ডান হাতটা আমার দিকে এগিয়ে দিলো—এই নাও তোমার টাকা।
ওকে দেখেই আমি আমার চেহারার কৌতুকমাখা হাসিটুকু এক লহমায় মুছে দিয়েছি। খুবই সিরিয়াস ভঙ্গিতে ওর ছোট্ট এইটুকুন হাত থেকে টাকাগুলো নিলাম। গুণতে যাচ্ছি দেখে নদী বললো—এখানে সাত টাকা আছে। একটা পাঁচ টাকার নোট আর দুইটা এক টাকার নোট। বাকি টাকা পরে দিয়ে দেবো।
ছোঁ মেরে ওকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিলাম—নারে মা তোর কাছ থেকে আমি কি টাকা নিতে পারি? আমার মেয়েটাকে বড় করতে হবে না অনেক বড়? মেয়েকে বড় করতে হলে বাবার তো টাকা খরচ হবেই। তুই যেটা চেয়েছিলি সেটাই এনে দেবো আমি। বল তোর কী চাই। কি চেয়েছিলি বল? ইতোমধ্যে ওর চিবুকে-ঠোঁটে-কপালে-গলায়-ঘাড়ে-বুকে-পেটে-নাকে-চোখে আমার অজস্র চুমুর তাণ্ডবে পর্যুদস্ত বেচারা খিলখিল করে হাসছে। বিশেষ করে ওর বুকে আর পেটে আমার গোঁফের সুঁড়সুড়ি লাগলে এমনিতেই বেচারি হাসতে হাসতে কাহিল হয়ে পড়ে। আজ চুমুর মাত্রাটা অন্য যে কোনো দিনের চেয়ে সহস্রগুণ বেশি। সুতরাং হাসতে হাসতে মেয়েটার আজ অজ্ঞান হবার দশা। শেষমেশ ওর মা এসে আমার কবল থেকে উদ্ধার করলো ওকে।
পঁচিশ বছর আগে মগবাজারে ডাক্তার লুৎফুন নাহারের ক্লিনিকে অক্টোবরের তিন তারিখের ভোরে আমাকে প্রথম দেখে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ছোট্ট এইটুকুন পাখির বাচ্চার মতো মেয়েটার ছাব্বিশতম জন্মদিন ছিলো গতকাল। দুপুরে কাজ থেকে দু’ঘন্টার ছুটি নিয়ে আমরা তিনজন মিলে অটোয়ার ডাউন টাউনে ওর খুব প্রিয় একটা বুফে রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম। সেইরকম একটা খাওয়া-দাওয়া হলো। জন্মদিন ছিলো বলে ওই রেস্টুরেন্ট নদীকে একদম ফ্রি খাওয়ালো! নদীর পেছনে আমার একটাকাও খরচ হয়নি এবার! ওর পেছনে আমার মোট খরচের পরিমাণটা সেই তিনশ সাতাত্তরই রয়ে গেলো!
নদী, আমাদের ছোট নদী,ভালো থাকিস রে মা। খুব বেশি দূরে চলে যাসনে এই বাবাটাকে ছেড়ে।
অটোয়া, কানাডা
