
ঢাকা থেকে নয় হাজার কিলোমিটার দূরের এক শহর। সে তুলনায় আমার বর্তমান বসতি টরন্টো থেকে আরো বেশী দূরে! প্রায় সাড়ে পনেরো হাজার কিলোমিটার। আট চল্লিশ বছর আগে ফোটা এক পদ্মকলির গল্প। জলের উপর এতোবড় পদ্ম ফুটতে দেখেনি কেউ! তাইতো দেখলেই চিনে ফেলে সবাই। স্ট্যাচু অব লিবার্টি, আইফেল টাওয়ার কিংবা সিএন টাওয়ারের মতো সিলমারা ল্যান্ডমার্ক। এর ছবি সামনে এলে শিশুটিকেও বলতে হয়না এটি সিডনি শহর।
হ্যাঁ যে স্থাপত্যের কথা হচ্ছে সেটি যে সিডনি অপেরা হাউজ, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই পাঠকের। কিন্তু কোথাও একটা ভুল হচ্ছে কি? এটি কি আদতে পদ্মফুলের শেপ? দিল্লীর লোটাস টেম্পল পদ্মাকৃতির সেটি এর নাম দেখেই বোঝা যায়। কিন্তু অপেরা হাউজের আকৃতি কি এমন?
জলভাগের সামনে থেকে দেখলে মনে হয় জলের উপর জাহাজ দাঁড়ানো। তার উপর অনেকগুলো পাল। তাই কেউ কেউ একে বর্ণনা করেন The building with series of gleaming arched white roofs sail-shaped shells like the sails of boats. যার পোডিয়াম হলো জাহাজের ডেক আর। ছাদ হলো জাহাজের পাল।
যেকোনো স্থাপনাকে বেশি কাছ থেকে দেখে এর আকৃতি উপলব্ধি করা বেশ কঠিন। অন্ধের হাতি দেখার অবস্থা! কেউ বলে খাম্বার মতো, কেউবা বলে দেয়াল।
আমজনতার উপলব্ধি যাই হোক কেনো, অপেরা হাউজের স্থপতি জর্ন অবার্গ উটজন (ডেনিস ভাষায় ভিন্ন উচ্চারণ) কী কনসেপ্ট মাথায় রেখে এটি করেছিলেন সেটি অনেকটাই অজানা। কেনোনা এখানে মাল্টিপল প্রাকৃতিক উপাদান, প্রাণী এবং উদ্ভিদের অবয়ব তিনি চিন্তায় এনেছিলেন।
২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার পত্রিকাগুলো স্থপতি জর্নের নতুন এক বক্তব্যে ঝড় তোলে। স্থপতি এটি ডিজাইন করেছিলেন অদ্ভূত এক চিন্তা মাথায় রেখে। তিনি বলেছিলেন, নির্মাণ শেষে এটি দেখে মনে হবে, লুক লাইক আ স্কুল অব গ্রেট হোয়াইট শার্কস এ্যাবাউট টু চম্প ডাউন অন দেয়ার ভিক্টিমস!
অথচ, এর বহু আগে, শুরুতে শোনা গিয়েছিলো স্থপতি জর্ন উটজন অপেরা ডিজাইন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন প্রকৃতির পাঁচটি শেপ বিবেচনায় রেখে। অপেরার জলজ অবস্থান, আকার, ব্যবহারিক দিক এর রং নির্বাচন করেছিলেন প্রকৃতি থেকে। এগুলো ছিলো পাখির ডানা, মেঘ, ঝিনুকের শেল বা খোলস, ওয়াল নাট এবং পাম গাছ। ১৯৫৬ সালে অপেরা ডিজাইন প্রতিযোগিতায় ২৩৩ জন স্থপতির সঙ্গে জর্ন উটজন অংশ নেন। ডেনমার্কে জন্ম নেয়া জর্নের ডিজাইনটি প্রথম স্থান পেয়ে জিতে নেয় ৫০০০ পাউন্ড। সে সময় অস্ট্রেলিয়ার মূদ্রা ছিলো পাউন্ড।
তবে পত্রপত্রিকায় ঝড় তোলা ২০১৩’র তথ্যটি বেশিরভাগ অস্ট্রেলিয়ানের ৪০ বছরের বিশ্বাস ভেঙে দেয়। তাঁদের ধারনা ছিলো এটি একটি শেল শেপের ছাদ বিশিষ্ট পাল তোলা জাহাজ যা সিডনি হারবারে দাঁড়িয়ে আছে। সরকারি দপ্তরের লোকজন পর্যন্ত নড়েচড়ে বসেন। বিচার বিশ্লেষণের জন্য বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে অসংখ্য ছবি তোলেন। তবে রহস্য রহস্যই থেকে গেছে। জনসাধারণ মূল বিশ্বাস থেকে পিছু হঠতে নারাজ। তাই ‘ফ্লিট অব সেইলস অন সিডনি হারবার’ ধারনাটি এখন পর্যন্ত টিকে গেছে। তবে রহস্যের একটি অনুমিত কিনারা নির্মাণ ইতিহাসে থাকতে পারে।
স্থপতির দেয়া ব্যাখার সাথে দর্শকের ধারনা মিলুক আর না মিলুক, একটি বিষয়ে সকলে একমত যে সিডনি অপেরার নান্দনিক সৌন্দর্য বিশ্বের অনেক বড় শিল্পকর্মকে হার মানিয়েছে। এর স্থপতি আসলে ‘স্থাপত্যশিল্পী’ নন, তিনি শিল্পী। পুরোমাত্রায় শিল্পী। জর্ন ওবার্গ উটজন যে প্রতিষ্ঠানে স্থাপত্য বিষয়ে পড়াশুনা করেছেন সেটি কিন্তু কোনো প্রকৌশল বা স্থাপত্য বিশ্ববিদ্যালয় নয়। তিনি স্থাপত্য বষয় নিয়ে পড়াশুনা করেছেন, রয়্যাল ডেনিস একাডেমি অব ফাইন আর্টস নামক একটি প্রতিষ্ঠানে।
পৃথিবীর অন্যতম সেরা আর্কিটেক্ট যাঁর একাডেমিক পড়াশুনায় সরাসরি ইঞ্জিনিয়ারিং সংযোগ নেই, এটি জানার পর অনেক চমকে উঠতে পারেন। বিশেষ করে এ প্রজন্মের প্রকৌশলীরা। তবে ইতিহাস ঘাঁটলে অনেক আর্কটিটেক্টের সন্ধান পাওয়া যায় যাঁরা ফাইন আর্টস পড়ে পরবর্তীতে নামকরা স্থপতি হয়েছেন। ইংল্যান্ডসহ অনেক দেশেই চারুকলা প্রতিষ্ঠানে ‘আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্ট’ রয়েছে। যদিও সেখানে প্রকৌশল বিভাগ নেই।
জর্ন উটজনকে অস্ট্রেলিয়া বা কোনো প্রাদেশিক সরকার ভাড়া করে আনেননি। উপরিউক্ত তথ্য অনুযায়ী স্থাপত্য প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করায় তিনি নিজেই এ যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। ১৯৫৭ সালে নিউ সাউথ ওয়েলস প্রাদেশিক সরকার সিডনি অপেরা নির্মাণের জন্য এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। ১৯৫৯ সালে নির্মাণ শুরু হয়। প্রকল্প মেয়াদ ৪ বছর নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম ব্যর্থ প্রকল্প ব্যবস্থাপনার শিকার হতে হয়েছিলো এই শিল্প নির্মাণে। ৪ বছরের জায়গায় ১৪ বছর। অনেকে মজা করে বলেন, বলেন প্রজেক্ট স্কেজ্যুলার ১৪ লিখতে ভুলে ৪ লিখেছিলেন!
খরচের বিষয়টিও তেমন। শুরু হয়েছিলো পাউন্ডের আমলে। শেষ হয় ডলার আমলে। ৭ মিলিয়ন পাউন্ডের প্রজেক্ট শেষ করতে নিউ সাউথ ওয়েলস সরকারকে গুনতে হয়েছিলো ১০২ মিলিয়ন ডলার। যদিও দূর্নীতি শব্দটা অপেরা নির্মাণে উচ্চারিত হয়েছিলো এমনটা খুঁজে পাইনি। কিন্তু অপরিকল্পনা এবং অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে শতবার।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এই অব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে ছিলেন স্বয়ং স্থপতি উটজান। স্টেট গভর্নমেন্ট বা প্রাদেশিক সরকারের দায় কম নয়। তাঁরা প্রকল্পের প্রকৌশল পরামর্শক নিয়োগ করেছিলেন ওভে আরুপ নামক একটি নামকরা ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মকে। বর্তমানে লন্ডন ভিত্তিক বিখ্যাত বহুজাতিক ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি আরুপ গ্ৰুপ। কানাডায় আরুপ কানাডা ইনক নামে প্রকৌশল সেবা দিচ্ছে।
আকার এবং আয়তন অনুযায়ী ভবন নির্মাণ কখনো স্থপতি ডমিনেটেড, কখনোবা প্রকৌশলী (বিশেষ করে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার) ডমিনেটেড হয়। সিডনি অপেরার আকার, আকৃতি এবং নন্দনতত্ত্ব অনুযায়ী এটি স্থপতি ডমিনেটেড হওয়াটা অযৌক্তিক নয়। তবে এর মেরিন স্ট্রাকচার (জলের গভীরে ফাউন্ডেশন), ছাদের অসংখ্য কার্ভেচার, মেকানিক্যাল এবং ইলেক্ট্রিক্যাল ডিজাইন ভবনটিকে প্রকৌশলী ডমিনেটেড করে তোলে। সে অনুযায়ী সুষ্ঠু নির্মাণ ব্যবস্থাপনার স্বার্থে নির্মাণ তদারকি বা প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট প্রকৌশলীদের হাতে রাখা জরুরী ছিলো।
আশ্চর্যের ব্যাপার হলো “ওভে আরুপ” কোম্পানিকে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ক্ষমতা দেয়া হয়নি। প্রাদেশিক সরকার স্থপতিকে সাথে নিয়ে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট নিজেরা করার চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু সরকারের ভেতরকার কেউ কিংবা আর্কিটেক্ট নিজে এতোবড় প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় মোটেও অভিজ্ঞ ছিলেন না। ফলে নির্মাণ কাজের অগ্রগতি মুখ থুবড়ে পড়েছে কয়েকবার।
অতিরিক্ত ডলার ঢেলে আবার চাঙ্গা করতে হয়েছে প্রকল্প। দুঃখজনক ভাবে বাদ দিতে হয়েছে স্থপতি জর্ন উটজানকে। নতুন স্থপতি নিয়োগ করা হয় পিটার হল নামে সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা আরেক মেধাবী আর্কিটেক্টকে। পনেরো গুন বেশি খরচে শেষ পর্যন্ত নির্মাণ সমাপ্তির মুখ দেখে। ফলাফলটা খারাপ হয়নি। জলেভাসা পদ্মকলি পদ্মফুল হয়ে সূর্যপানে হেসেছে। সেই হাসি দেখতে লক্ষ পর্যটক প্রতিবছর সিডনি নগরী ভ্রমণ করছে।
৬৫ মিটার বা ২০ তলা উঁচু এই ভবনের নির্মাণ মূলত তিনটি ভাগে শেষ হয়। ১৮৩ মিটার লম্বা এবং ১২০ মিটার চওড়া পোডিয়াম (এর ফাউন্ডেশন, বীম এবং কলাম), রুফ বা ছাদ এবং ইন্টেরিওর। প্রথম ভাগ ছিলো সবচে চ্যালেঞ্জিং। মেরিন স্ট্রাকচার অথবা নদীর উপর ব্রিজ নির্মাণের মতো জটিল। ভুল ক্যালকুলেশনের কারণে বেশ কয়েকটি কলাম রিডিজাইন করতে হয়েছিলো। ছাদের ওজন বহনের পর্যাপ্ত ক্ষমতা কলামের ছিলোনা। পরে এগুলো পরিবর্তন করে ছাদের কাজ শুরু করা হয়।
প্রায় সাড়ে চার একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত অপেরা হাউজটি ১৯৭৩ সালে রানী এলিজাবেথ উদ্বোধন করেন। ভেতরে বেশ কটি হল থিয়েটার, কনসার্ট, নাটক, মিটিং এবং শ্যুটিং ষ্টুডিও হিসাবে ব্যবহৃত হয়। কনসার্ট হলে প্রায় ২৭০০ মানুষ একত্রে গান শুনতে পারেন। থিয়েটারে মুভি দেখেন প্রায় দেড় হাজার মানুষ। নাটকের হলগুলো ৪০০ থেকে সাড়ে ৫০০ জনের। মিটিং করেন একত্রে ২১০ জন। সবগুলো ইভেন্ট একত্রে চললে প্রায় পৌনে ৬ হাজার মানুষের সমাগম বেশ স্বচ্ছন্দে করা যেতে পারে এখানে।
টরন্টো, কানাডা
