কেমন ছিলেন তিনি?

আমার শ্বশুর প্রফেসর খোন্দকার মোখলেসুর রহমান একজন ভাল মানুষ ছিলেন

আমার শ্বশুর প্রফেসর খোন্দকার মোখলেসুর রহমান একজন ভাল মানুষ ছিলেন।

কথাটা একজন মেয়ের জামাই হিসেবে বলছি না। কথাটা বলছেন উনার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-প্রতিবেশী এমনকি এখানে যে তিনি এসে আমার বন্ধু বান্ধবের বাবা মায়ের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করেছিলেন, বা ওয়ালমার্টে বা বিভিন্ন গ্রোসারি স্টোরে যাবার সুবাদে নানান বয়সী মানুষের সাথে তাঁর মাঝেমাঝে দেখা হতো, তাঁদের প্রত্যেকেই। যে কারনে সোমবার কর্মব্যস্ত দিন হওয়া সত্বেও তাঁর জানাজা ও দাফনে বহু মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন। অনেকে পরে খবর পাওয়ায় আফসোস করেছেন যে তাঁরা আগে খবর পেলে অবশ্যই আসতেন। মৃত্যুর সময়ে মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা পাওয়ার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে?

- Advertisement -

তিনি বাগান করতে পছন্দ করতেন। আমাদের ব্যাকইয়ার্ড উনার জন্য ছেড়ে দিয়েছিলাম। নানান জাতের সব্জির ফলনে বাড়ির পেছনের একটা অংশ ভরে ফেলেছিলেন। এর ফলনের ৯৯% লোকজনকে দিয়ে দিতেন। বিশেষ করে বাসায় লাউয়ের বাম্পার ফলন হতো। প্রতিদিন চল্লিশ পঞ্চাশটা কেবল ফুলই ফুটতো। ফ্রী ফসল দিতে দিতে আমরাই ক্লান্ত হয়ে যেতাম।

আমি শাক সবজি নিতান্ত ঠ্যাকায় না পড়লে খাই না, আর উনার এত এত সবজি যে কত খাবেন? এক সিজনে শ খানেক কেবল লাউই হতো। সাথে ঢ্যাঁড়স, শিম, লেটুস, বিটরুট, শাক ইত্যাদি ইত্যাদি – কত খাওয়া যায়? পরিচিতদের দিয়ে আসা হতো। অপরিচিতদেরও দিতাম। মসজিদে নামাজ শেষে লাউ দিয়ে বলতাম যার যার লাগবে নিয়ে নিন। গ্রোসারি স্টোরের অপরিচিত, কিন্তু জাতিতে বাংলাদেশী, কিংবা আমার ক্রিকেট গ্রূপের ছেলেরা – সবাইকেই যেচে পড়ে অর্গানিক লাউ দিয়ে আসতাম। বাজারে বিক্রি করলে নিশ্চিত হাজার খানেক ডলার পকেটে আসতো। অর্গানিক সব্জির দাম ও চাহিদা দুইটাই বেশি। কিন্তু এই টাকা দিয়ে কি হবে? তিনিতো টাকার জন্য কাজটা করেননাই। বরং বিনিময়ে শুধু দোয়া নিয়েছেন। এবং বাস্তবতা হচ্ছে, মৃত্যুর পরে তিনি একটা সিঁকি পয়সাও নিয়ে যেতে পারেননি। তাঁর কাফনেও কোন পকেট ছিল না। যা নিয়েছেন সেটা বিভিন্ন মানুষের দোয়া।

আমার পরিচিত সবাই অবাক হয়ে প্রশ্ন করতেন “আমরাওতো গাছ লাগাই। এত ফল আমাদের হয়না কেন?”

উত্তর হচ্ছে, তিনি গাছপালার যেমন যত্ন নিতেন, মানুষ নিজের সন্তানেরও এতটা যত্ন নেয়না। সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা – গাছের জন্য পানি, সার, আগাছা, পোকামাকড় পরিষ্কার ইত্যাদি কাজ ধৈর্য্য ও আনন্দের সাথে করতেন। কোন গাছ অকালে মরে গেলে সারাদিন মন খারাপ করে থাকতেন। আল্লাহ উনার হাতে তাই এত বরকত দিতেন।

উনার লাগানো আপেল গাছে সেদিন দেখলাম নতুন ফুল ধরেছে। উনার লাগানো গোলাপ গাছের ফুল এখনও ঝরেনি। নতুন মৌসুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওরাও উনাকে খুব মিস করবে। এত যত্ন করে ওদের আর কেউ লালনপালন করবেনা।

ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কঠিন যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন। এডভান্সড স্টেজের লাং ক্যান্সার যখন ধরা পড়লো, তিনি খুব ভেঙ্গে পড়েছিলেন। অথচ তাঁর ভাগ্যটা দেখেন, ঘটনাচক্রে পৃথিবীখ্যাত এক চিকিৎসকের হাতে পড়ে (নার্সের মতে মেডিকেল ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি নাকি একজন সুপারস্টার চিকিৎসক, যাকে নিয়ে গোটা আমেরিকাতেই টানাটানি চলে – দেশের বাইরে থেকেও লোকে উনার কাছে আসে) ক্যান্সারমুক্ত হলেন। আমরা ধরে নিলাম আল্লাহর রহমতে বিপদ আপাতত টলেছে।

কিন্তু আমাদের আয়ু যতটুকু লেখা থাকে, আল্লাহ আপনাকে ঠিক ততটুকুই সময় দেন।

সান্তনা এটাই যে তিনি রমজান মাসে, সুস্থ দেহে, মোটামুটি কোন কষ্ট ছাড়াই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। বিদায়ের আগে দেশে গিয়ে নিজের বড় মেয়ে, নাতি নাতনি, মেয়ের জামাই, আত্মীয়স্বজন সবার সাথেই দেখা করে আসতে পেরেছেন।

মৃত্যু যেখানে লেখা থাকে, মানুষ লাখ টাকার প্লেনের টিকিট কেটেও সেই ঠিকানায় হাজির হয়। তিনিও ব্যতিক্রম ছিলেন না।

ইসলামী মতে আমাদের জন্য আমাদের বাবা মায়েরা হচ্ছেন বেহেস্তে যাওয়ার সবচেয়ে প্রশস্ত পথ। আল্লাহকে খুশি করার সবচেয়ে সহজতম উপায় হচ্ছে বাবা মাকে খুশি করা। বাবা মা খুশি, তো আল্লাহ খুশি। বাবা মা অসন্তুষ্ট, তো আল্লাহও অসন্তুষ্ট। আমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি যে দোয়ার হাত উঠে, সেটাও সেই বাবা মায়েরই হয়ে থাকে। আমার বৌ যখনই কোন টেনশনে থাকতো, বা বিপদের শংকা করতো, আমার শ্বশুরকে বলতেন দোয়া করতে। এদেশে আমাদের নানান সমস্যায় আমার শ্বশুর শ্বাশুড়ি টেনশন করলে আমি সবসময়েই বলতাম, “আপনাদের কাজ দোয়া করা, আপনারা দোয়া করবেন। টেনশন করেতো লাভ নেই।”

উত্তরে তিনি আমার বৌকে বলতেন, “মারে, আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে এক্সট্রা দুই রাকাত নামাজ পড়ি শুধু তোমার জন্য দোয়া করতে।”

যখন আমি তাঁকে শেষ গোসল দিচ্ছিলাম, সেই হাতগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করছিলাম, মনে হচ্ছিল, এই হাত আর কখনই দোয়ার জন্য উঠবে না।

আমার স্ত্রীর “বেহেস্তে যাওয়ার সবচেয়ে প্রশস্ত পথের” অর্ধেকটা বন্ধ হয়ে গেল।

আমার বাবা চলে গেছেন সেই ২০১১ সালে। তাঁর মৃত্যুর সময়ে, জানাজায়, দাফনে আমি থাকতে পারিনি। আল্লাহ এবার আমার কাঁধে সেই ঋণ শোধের সুযোগ দিলেন। বিদেশের মাটিতে অত্যন্ত গোছানোভাবে তাঁর জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করতে পেরেছি, এজন্য আল্লাহর কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা।

আগেও জানতাম তবে এইবার আমি আরও ভালভাবে উপলব্ধি করলাম, মানুষের জীবন কতটা ঠুনকো, কতটা অস্থায়ী! একদিন আগেই যে ব্যক্তি বাংলাদেশ থেকে এলেন, একদিন পরেই তিনি কবরে শুয়ে গেলেন। কিছুক্ষন আগেও যার সাথে কথা বলেছি, দশ-পনেরো মিনিটের ব্যবধানে প্যারামেডিক্সরা তাঁর পালস খুঁজে পাচ্ছিল না। পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতি, শক্তিশালী ঔষধ, একদল অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি – কিছুতেই কিছু লাভ হলো না।

মৃত্যুর এক সেকেন্ড পরেই আমরা নিজের হাতের আঙ্গুল নাড়ানোর মতন সামান্য কাজটাও করতে পারিনা, অথচ কত দম্ভ, দাপট নিয়ে আমরা ঘুরে বেড়াই!

আমার ছেলেরা প্রথমে বুঝতেই পারেনি ওদের নানা মারা গেছেন। ওরা ভেবেছে “নান ভাইয়া” হসপিটালে গেছেন, সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন। যখন গতকাল কবর জিয়ারতে নিয়ে গেলাম, তখন ওরা খুব অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো, “নান ভাইয়া এখানে মাটির নিচে কেন শুয়ে আছেন?”

বললাম আল্লাহর কাছে উনার জন্য দোয়া করতে।

ওরা প্রথমেই যে দোয়া করলো, সেটা হচ্ছে “হে আল্লাহ! Make Nan bhaiya alive again!”

আহারে বাচ্চাগুলি! পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা এখনও বুঝতে শিখেনি।

আমি দাদা দাদি নানা নানীর আদর পেয়েছি। দাদা আমার অনেক ছোট বয়সে মারা গিয়েছিলেন, কিন্তু জানি তিনি কতটা ভালবাসতেন। তাই আমি চাইতাম আমার ছেলেরাও এই আদর ও আনন্দ পাক। বিদেশে থেকে অনেকের ভাগ্যেই সেটা জোটে না। আমার বাচ্চাদের ভাগ্য ভাল। ওরা দাদার আদর না পেলেও দাদি, নানা, নানীর আদর পেয়েছে। আরেকটু বেশি পেলে হয়তো আরও অনেক স্মৃতি জমা হতে পারতো, কিন্তু আল্লাহর মর্জি। আমাদের কিছুই করার নেই।

তাঁর জীবনটা কেমন ছিল? বলবো, আলহামদুলিল্লাহ। কোন অতৃপ্তি থাকার কথা না। আজীবন দেশের বেশ কিছু সরকারি কলেজে চাকরি করেছেন। তিনি ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন, সেই কলেজেই প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এটা যেকোন ছাত্রের জীবনের সবচেয়ে গর্বের বিষয়। আরও কিছু কলেজে প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে রিটায়ার্মেন্টে গেছেন। হাজার হাজার ছাত্র মানুষ করেছেন। ওরা দেশবিদেশে ছড়িয়ে আছে। নিজের পরিশ্রমের টাকায় বাড়ি করেছেন। দুই মেয়ে মানুষ করেছেন। বিয়ে দিয়েছেন। নাতি নাতনিদের দেখে গেছেন। মৃত্যুর আগেও ভ্রমনের কারনে কাজা হওয়া দুই ওয়াক্ত নামাজ ঠিকই আদায় করে গেছেন।

আমরা যখন গাড়িতে এদিক সেদিক বেড়াতে যেতাম। উনাকে দেখতাম মোবাইল এপে নামাজের সময় হওয়া মাত্রই তিনি সেই অবস্থাতেই নামাজ আদায় করে ফেলতেন। আমি বলতাম আধা ঘন্টা-বিশ মিনিট অপেক্ষা করলেইতো বাড়িতে গিয়ে আরামসে নামাজ পড়তে পারেন।

তিনি আমার কথাটা পাত্তা দিতেন না। তিনি প্রভুর ডাক আসা মাত্রই সাড়া দেয়ায় বিশ্বাসী ছিলেন।

এবং এর গুরুত্বটা আমি তাঁর মৃত্যুর দিন টের পেয়েছি। আমাদের মৃত্যুর সময় যখন চলে আসে, একটা মিনিটও বাড়তি সময় পাওয়া যায় না। একটা সেকেন্ডও না।

উনাকে নিয়ে বলতে বসলে বহুকিছু বলার যাবে। সংক্ষেপে বললে আবারও বলবো, তিনি একজন ভাল মানুষ ছিলেন। তাঁর পরিচিত, আত্মীয়, অনাত্মীয় সবার এটাই সাক্ষ্য। এক জীবনে একটা মানুষের জন্য আর কি লাগে?

আপনারা উনার জন্য দোয়া করবেন। উনার পরিবারের জন্যও দোয়া করবেন।

- Advertisement -

Read More

Recent