রিখটার স্কেল ম্যাগনিচ্যুড ৭.১

দড়াম করে ল্যাপটপ আছড়ে পড়লো বাঁধের ডেকের উপর

দড়াম করে ল্যাপটপ আছড়ে পড়লো বাঁধের ডেকের উপর। কংক্রীটের খাড়া ওয়ালের প্যানেলে রেখে মনিটরে সিসমোগ্রাফ দেখছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির সিসমোলজিস্ট ড. লরেন্স হায়েস। হঠাৎ করে পেছন থেকে কেউ বুঝি ধাক্কা দিলো তাঁকে ! ল্যাপটপের সাথে নিজেও আছড়ে পড়লেন ডেকে। কনুইয়ে ভর দিয়ে স্ক্রীনের উপর চোখ রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করলেন। ছানাবড়া হয়ে গেলো চশমার নীচে রাখা আইবলের রেটিনা।

ও মাই গড! রিখটার স্কেল ম্যাগনিচ্যুড ৭.১। তারমানে ধাক্কাটা অতিপ্রাকৃত ভৌতিক কিছু নয়। বরং প্রকৃতির অতিরুদ্র ভৌত রূপ।

- Advertisement -

রেডিও ক্র্যাডল হাতে নিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলেন। ও প্রান্তে ড. কিম পার্ক। ক্যালটেকের দুই গবেষক ড. হায়েস এন্ড ড. পার্ক হুভার ড্যামের একটি ফাটলের কারণ নির্ণয় করতে এসেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার প্যাসাডেনা থেকে। কারণ নির্ণয় করেছিলেন ঠিকই। কিন্তু হঠাৎ ভূমিকম্প কেড়ে নেয় ড. পার্কের জীবন। পা হড়কে কংক্রীটের রিইনফোর্সিং রডের আঘাতে তাঁর মৃত্যু ঘটে। ঘটনার বাকী অংশ স্যান এন্ড্রিয়াস মুভিটি যাঁরা দেখেছেন তাঁদের সবার জানা। যাঁরা বড় পর্দায় ছবিটি দেখেননি তাঁরা হুভার ড্যামের কাল্পনিক ক্র্যাক দেখতে ছোট পর্দায় ‘স্যান এন্ড্রিয়াস’ দেখে নিতে পারেন।

হুভার ড্যাম নিয়ে সিনে বিশ্ব যেনো তোলপাড়। এযাবত ডজন খানেক সিনেমা হয়েছে। হলিউড ফিল্মপাড়া থেকে মাত্র ৩০০ মাইল পূবে নেভাদা অঙ্গরাজ্যে হুভার ড্যামের অবস্থান। সিনেওয়ালাদের তাই সবচে প্রিয় বাঁধ হুভার ড্যাম। অসংখ্য সিরিয়ালেও এই ড্যাম দেখানো হয়েছে। প্রায় সবগুলোই থ্রিলে ঠাঁসা। রোমাঞ্চ জড়িয়ে আছে পরতে পরতে। কারণ কি?

একটা যথাসম্ভব কারণ হুভার ড্যাম নিজেই একটা থ্রিল। ১৯৩১ সালে এতো উঁচু কংক্রীটের ওয়াল তৈরী করা থ্রিলিং মুভিকে হার মানাবে। ২২১ মিটার উচ্চতার গ্রাভিটি ওয়াল আজকের বাজারে ৭৫ তলা ভবনের সমান উঁচু। ৭৫ তলা ভবনের খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে নিচে প্রবাহিত জলস্রোতে কল্পনায় একবার লাফিয়ে পড়ুন। দেখুন… শিরদাঁড়ায় রোমাঞ্চের শীতল স্রোত নামে কিনা!

হুভার ড্যামের নির্মাণ কাহিনী বলার আগে এর অবস্থানটা পরিষ্কার করা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট কোস্ট সম্পর্কে যাঁদের ধারণা আছে তাঁরা হুভার ড্যামে বেড়াতে না গেলেও চিনতে কষ্ট হবেনা। লস এঞ্জেলেস শহরতলী থেকে হাইওয়ে ধরে সাড়ে চার ঘন্টা পূর্ব দিকে। আ্যারিজোনা এবং নেভাদা অঙ্গরাজ্যের বর্ডারে। এক রাজ্যের জল বাঁধ উপচিয়ে ঝরে পড়ছে আরেক রাজ্যে। বড়ই সৌন্দর্য। তবে আলাদা দেশ হলে ভূ-জলের রাজনীতি কি হতো, সেটি বাংলাদেশের মতো ভুক্তভোগী দেশগুলো ভালো জানে।

আর যাঁরা ক্যাসিনোতে থ্রিল খুঁজে পান তাঁদের জন্য আরো সহজ খবর হলো, ওয়ার্ল্ড ক্যাসিনো ক্যাপিটাল লাস ভেগাসের কোলেই বসে আছে নান্দনিক বাঁধ হুভার ড্যাম। দখিণা বাতাস খেতে খেতে আধাঘন্টা দক্ষিনপূর্বে গাড়ি হাকালেই হবে। হঠাৎ দেখবেন স্থলসীমা শেষ হয়ে জলের রাশি। কলোরাডো নদীর জলরাশি। বাঁধের কাছে সরু আকার ধারণ করলেও একটু এগিয়ে পূবে গেলে চওড়া নদীর সুবিশাল জলাধার। আরেকটু পূবে সাগরসম লেক মিড।

লেক মিড যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ জলাধার। কলোরাডো নদীর উৎপত্তিস্থল। থমাস আলভা এডিসন তখন সবে বিদ্যুত উৎপাদনের যন্ত্রপাতি আবিষ্কার এবং বাজারজাত করেছেন। তাঁর আবিষ্কার মাথায় রেখেই প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভার ১৯২৮ সালে বিপ্লবী সিদ্ধান্ত নিলেন। জলবিদ্যুতের বৃহত্তম প্রকল্প করবেন কলারাডো নদীর প্রবাহে বাঁধ দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র এরিমধ্যে এডিসনের আবিষ্কারর কাজে লাগিয়ে ছোটখাটো উৎপাদনের অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেলেছে।

বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে প্রেসিডেন্ট ‘হার্বার্ট হুভার’ কংগ্রেস থেকে অর্থ বরাদ্দ পাশ করিয়ে নিলেন ঐবছরেই। রিপাবলিকান নেতা হুভার নিজেও একজন প্রকৌশলী। খবরটি হুভার ড্যাম ভক্তদের অনেকেরই অজানা। অর্থ বরাদ্দে মরিয়া হবার পেছনে এটি দারুণ মন্ত্র যুগিয়েছে। পরে অবশ্য সমস্যা দাঁড়ালো সামর্থ্যবান কন্ট্রাক্টর সিলেকশনে। এতোবড় কন্ট্রাক্টর কোথায়? পরামর্শ করে ছয়টি কোম্পানির সবাই মিলে একটি কনসোর্টিয়াম তৈরী হলো। নাম দেয়া হলো সিক্স কোম্পানিজ ইনক্। এই কনসোর্টিয়ামই ১৯৩১ সালে নির্মাণ যাত্রা শুরু করে। ৬ কোম্পানীর সমন্বিত নির্মাণ ব্যবস্থা মাত্র ৫ বছরেই বিশাল কর্মযজ্ঞ সাধন করে। উনিশটি টারবাইনে ২০৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করে। বিদ্যুত সরবরাহ করে তিন অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যারিজোনা এবং নেভাদায়।

কাজ শুরুর পরেই ক্ষমতায় এলেন যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি ডেমোক্র্যাট নেতা ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট। বাঁধের কাজ বিন্দুমাত্র পেছাতে দেননি তিনি। মহান এই নেতা ডেমোক্রেটিক পার্টির হলেও বাঁধের হুভার নামকরণ নিয়ে মাথা ঘামাননি। যদিও ফার্স্ট সেক্রেটারী অব ইন্টেরিয়র হুভারকে অপছন্দ করায় কাগজপত্রে মন্ত্রণালয় একে বোল্ডার ড্যাম নামে ডাকতে শুরু করে। কারণ ড্যামের ঠিকানা নেভাদা অঙ্গরাজ্যের ক্লার্ক কাউন্টির বোল্ডার সিটিতে। ১৯৪৭ সালে বিষয়টির সুরাহা হয়। কাগজপত্র এবং সামাজিকভাবে এর স্থায়ী নাম হয়ে যায় হুভার ড্যাম।

সরকারের পক্ষ থেকে এ বাঁধের মালিকানা স্বত্ত্ব এবং পরিচালন দায়িত্ত্ব ইউএস ব্যুরো অব রিক্লামেশনের। বাঁধের ডিজাইন করেন প্রতিষ্ঠানের সেসময়কার প্রধান ডিজাইন প্রকৌশলী জন এল. স্যাভেজ। তিনি পানির চাপ এবং অন্যান্য প্যারামিটার হিসেব কষে ওয়েজ-শেপে গোড়ায় ৬৬০ ফুট এবং উপরে ৪৫ ফুট চওড়া করে কংক্রীটের ডিজাইন করেন। উপরের ৪৫ ফুটের উপর দিয়ে গাড়ি চলাচল করে। বাঁকানো শেপের দৈর্ঘ্য খুউব বেশী নয়। প্রায় ৩৮০ মিটার।

নির্মাণ কাজের তদারকিতে দুই মহান প্রকৌশলী ফ্রাংক ক্রো এবং ওয়াকার ইয়াং। হাজার হাজার এ্যাপাচি ইন্ডিয়ান শ্রমিক এই প্রকল্পে কাজ করেছেন। তাঁরা ভিত্তির খনন শেষ করে ৬ জুন ১৯৩৩ সালে কংক্রীট ঢালাই দেন নির্ধারিত সময়ের ১৮ মাস আগে! আজকের দিনে একজন পরামর্শক প্রকৌশলী হিসাবে আমি নিজেও ভেবে অবাক হই। সেরকম কোনো মেকানিক্যাল লজিস্টিক ছাড়াই এতোবড় যজ্ঞ দ্রূততম সময়ে কি করে সম্পন্ন হলো? এর অন্যতম কারণ প্রথমে প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভার, পরে রুজভেল্টের সরাসরি সহযোগিতা।

৩৩ লক্ষ ৩০ হাজার কিউবিক মিটার অর্থাৎ প্রায় ১১ কোটি ৭৬ লক্ষ সিএফটি (ঘনফুট) কনক্রীট ব্যবহৃত হয় পুরো নির্মাণে। এখনকার দিনে যে কংক্রীট ট্রাক রাস্তায় চলতে দেখা যায় সেগুলোর মাপে ৩ লক্ষ ৭০ হাজার ট্রাক কংক্রীট।

হেলথ, সেফটি এবং এনভায়রনমেন্ট সংক্ষেপে বলা হয় এইচএসই। সেসময় এইচএসই’র বালাই ছিলোনা। নির্মাণকর্মী, সার্ভেয়ার এবং প্রকৌশলীরা অকাতরে দেশের জন্য, মানুষের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। হুভার ড্যাম প্রকল্পে প্রাণ হারিয়েছেন ১১২ জন নির্মাণ কর্মী। এঁদের একজন সরাসরি নির্মাণে ছিলেননা। ভিজিটর হিসেবে এসেছিলেন।

স্বীকৃতির পোস্টমর্টেমে দেশপ্রেমিক হিসেবে বিভিন্ন পেশার মানুষের নামের আগে দেশপ্রেমিক খেতাব জুটলেও প্রকৌশলীদের নামের আগে তা জোটেনা।

সেসব আরেক ট্রাজেডি! অন্যদিন অন্যগল্পে না হয় বলা যাবে। …কেবল একটি অথেনটিক তথ্য শেয়ার না করে পারছিনা। কদিন আগে জেনেছি আমার ইতালিয়ান কলিগ গায়েতানো ভিকরির কাছে। বাংলা মেইলে প্রবন্ধটি প্রকাশিত হবার পর। প্রকল্পের প্রথম শহীদের পুত্রই ছিলেন শেষতম শহীদ।

প্রকৃতির লীলা বোঝা বড় দায়!

টরন্টো, কানাডা।

- Advertisement -

Read More

Recent