
মধ্যরাতে প্লেস দ্যা আর্টস থেকে শেষ মেট্রোতে বাসায় ফিরছি। ৮/১০টা কম্পার্টমেন্টের গ্রীন লাইনের পুরো মেট্রোতে হাতে গোনা ৫/৭ জন যাত্রী। ভাল করে তাকিয়ে দেখি এ পাঁচ সাতজনের একেকজন একেক বর্নের, ভিন্ন ভিন্ন ভাষার মানুষ। কেউ চাইনীজ বা ভিয়েতনামী, কেউ আফ্রিকান, কেউ এরাবিক, কেউ বা ল্যাতিন আমেরিকার হবে হয়তো। অনুমান করি প্রায় সবারই বয়স মধ্য তিরিশের কোঠায়। এরা সম্ভবত রাতের পালায় কাজ শেষ করে ফিরছেন। দেখতে দেখতে ম্যাকগিল স্টেশনে মেট্রো এসে থামল। এ পাঁচ সাতজনের কেউ নামল না। কিন্তু উঠলো আরো জনা পাঁচেক। এর মধ্যে ২ জন চাইনীজ গার্ল। বাকী তিনজনের একজন বেশভুষা ও চেহারায় বাঙালী মনে হলো। যুবকটি পাশাপাশি দুই সিটে পা তুলে আয়েশ করে বসেছেন। ফোনে কার সাথে যেন বেশ শব্দ করে পরিস্কার বাংলায় কথা বলছেন।
পিল স্টেশনেও তেমন কেউ একটা উঠলো না। বরং নেমেছে ২/১ জন। পুরো মেট্রোতে আমরা হাতে গোনা কিছু যাত্রী। বাঙালী যুবকটি কথা শেষ করে বেশ আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলো।
– ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আর ইউ বাংলাদেশী?
মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতে যুবকটি হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, দুঃখিত, আমি আপনাকে এভাবে জিগেস করায়।আসলে দেশের মানুষ দেখে পরিচয়ের লোভ সম্বরন করতে পারিনি।
যুবকটির বয়স তিরিশ ছুঁই ছুঁই। হাল্কা গোঁফ আছে। লম্বায় প্রায় পাঁচ ফিট আট/নয়। পরিচয়পর্বের শুরুতে জানালো, তার নাম সুজিত। দেশের বাড়ি ফরিদপুর। এখানে এসেছে মাস ছয়েক হলো। দেশে কাজ করত লালমনিরহাটে একটি এনজিওতে। পিতৃহীন পরিবারের মা সহ ছোট ছোট ভাইবোন মিলে ৮ জনের সংসার।
আমি দেশে কি করতাম জেনে সুজিত প্রথম পরিচয়ে কেন যেন আমাকে তার আপন ভেবে অনেক কথাই বলা শুরু করে। এখানে সাধারনত কেউ কারো ব্যক্তিগত বিষয়, অতীত নিয়ে কথা বলে না, জানতেও চায় না। আমি সুজিতের কথায় অস্বস্তিবোধ করি না। একটু ক্লান্ত থাকায় ঠিক তাল মেলাতে পারছিলাম না। কথা বলায় ছেলেটার আগ্রহ দেখে থামাই না। আমি ওর কথা শুনি মনযোগ দিয়ে। আহারে ছেলেটা হয়ত কতদিন মন খুলে কথা বলেনি!
আমার স্টেশন তো অনেকদূরে, সুজিত বলুক আমি শুনি।
নব্বই দশকে বাবরি মসজিদ ভাংগায় যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লেগেছিল ভারতে তার হিংসাত্বক আগুনে পুড়েছিল বাংলাদেশও। হিন্দু সম্প্রদায়ের অসংখ্য নিরীহ মানুষের ঘরবাড়ি পুড়েছিল। সেই সময় রেহাই পায়নি সুজিতদের ভিটেবাড়ি। প্রান বাঁচাতে এক কাপড়ে সুজিতরা গ্রাম ছাড়া হয়ে প্রথমে গোপালগঞ্জে এক পিসির বাড়িতে ছিল কিছুদিন এবং পরবর্তী সময় ছোট ছোট বোনগুলোর নিরাপত্তার কথা ভেবে ঢাকায় উদ্বাস্তু জীবন বেছে নিয়েছিল সুজিতরা।
মা, তিনবোন ও দুই ভাই ২০০০ সালে চিরতরে মাতৃভুমি ছেড়ে চলে যায় পার্শ্ববর্তী দেশে। দেশে থাকা ছোটভাইও ২০১৮ সালে চলে যায় কোলকাতায়। একে একে সবাই চলে যাওয়ায় দেশের সাথে আর কোন সম্পর্ক থাকলো না দেখে সুজিতও একসময় স্থির করে যেতেই যখন হবে পার্শ্ববর্তী দেশে নয়, চলে যাব পশ্চিমা কোন দেশে। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে চোখের জল নাকের পানি একাকার করে ২০১৮’র অক্টোবর মাসে চলে আসে আমেরিকা হয়ে কানাডায়।
-ভাই, ভিন্ন ধর্মের হওয়ায়, সংখ্যালঘু ছিলাম দেশে। যাদের সাথে বড় হয়েছি, সারাজীবন কেটেছে তারাও কেমন বদলে গেছে। সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত ছোঁয়ায় ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্ত হয়েছিলাম। নিজের দেশেও কেমন পরাধীন জীবন ছিল! উন্নত বিশ্বে এসেও উদ্বাস্তু জীবন, মূলস্রোতে আদৌ মিশে যেতে পারব কিনা জানি না। খুব মনপোড়ে দেশের জন্য। বাড়ির আঙ্গিনায় বকুল গাছ, পিছনে নারিকেল বাগান, বাঁশঝাড় কত কিছুর জন্য মন কাঁদে।
আহা কি দিন ছিল!
আমি কেন যেন সুজিতের কথায় বিষন্নবোধ করি। এই মধ্যরাতে আমার মন ভারী হয়ে উঠে। কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতার তান্ডব চালিয়ে বাস্তভিটাচ্যুত করে দেশ ছাড়া করছে সংখ্যালঘুর নামে মানুষকেই।
কথা বলতে বলতে আমার স্টেশনে মেট্রো থামতে আমি নেমে পড়ি। বিদায়মুহুর্তে সুজিতকে বলি, ভাল থেকো ভাই।তবুও বুকের মাঝে দেশটাকে ভালোবেসে আঁকড়ে রেখো।
মন্ট্রিয়ল, কানাডা
