তেলিগাতি হ র র: (খন্ড ১)

কুয়েটের লালন শাহ হলে এলেই আমার ঘুমের পরিমান বেড়ে যায়

ঢাকায় হাওয়া বদল শুরু হয়েছে। চিটচিটে খুসখুসি গরম। খুলনা ফিরেছি দুদিন হলো। শীত ভাবটা এখনো আছে এখানে। কুয়েটের লালন শাহ হলে এলেই আমার ঘুমের পরিমান বেড়ে যায়। বিশেষ করে সকালে। সবাই ক্লাশে চলে যায়। পুরো হল থাকে শান্ত নিঝুম। আমি ঘুমোই। শান্তির ঘুম। ক্লাশ ফাঁকি দেয়া পরম নিশ্চিন্তের ঘুম।

সকালে ঘুমোনোর আরেকটি কারণ রাতে আমাকে নিশি পেতো। এই ‘নিশি’ আবার আমার একা যাওয়া পছন্দ করতো না। বলতো মাকসুদ কে সাথে নিয়ে এসো। মাকসুদ আমার রুমমেট। ক্লাশমেট। সার্বক্ষণিক সাথী। মধ্যরাতে দুজন আলগোছে বেরিয়ে যাই রুম থেকে। পায়ের খসখস শব্দে কখনো আরেক রুমমেট দিলীপের ঘুম ভেঙে যায়। দরদ ভরা কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, দোস্তো এতো রাইতে কই যাও? পাশে সিরিয়াস স্টুডেন্ট রউফ। রুমের ফোর্থ সিটিজেন। সিভিল ডিপার্টমেন্টে এক ব্যাচ জুনিয়র। এখনো মুখ গুজে আছে বইখাতায়। হয়তো কাল ক্লাশ টেস্ট! মিটমিট করে শুধু হাসে। আমার চলনে বলনে এতোদিনে সে বুঝে গেছে ‘জিগায়া লাভ নাই।’

- Advertisement -

ইকবাল চত্ত্বর থেকে খানজাহান আলী হলের পথটা বেশ দীর্ঘ। দখিনে সমুদ্দুর, মানে কুয়েটের “থ্রী ইডিয়টস”দের স্নানাগার। বিশাল এক তালপুকুর। শান্ত জলের উপর মৃদু দখিনা বাতাস। বাতাসে ভেসে আসে হলের কোনো উদাসী রুমে বাজানো কুমার বিশ্বজিৎ।

এখন অনেক রাত

পৃথিবী ঘুমিয়ে গেছে

শুধু তোমার স্মৃতি

নিদ্রবিহীন বুকে মোর

জেগে আছে………

কে যে বাজাতো গানটা? আজো অজানা! রাত দুটোয় নিদ্রাহীন ভাইটি এখন নিশ্চয়ই শান্তিতে ঘুমান। যার জন্য রাত জাগা সে রূপসীই হয়তো পাশে শুয়ে এখন!

নিশি রাইতে নিরুদ্দেশের পথে এলেবেলে হাঁটা। কখনো ফুলবাড়ি গেটে মান্নান ভাইয়ের চায়ের দোকান থেকেই ফিরে আসা। কখনোবা মধ্যরাতের সওয়ার হয়ে রিক্সায় দৌলতপুর, ভৈরব নদী, রেল লাইনের তরল গলি কিংবা তেলিগাতির আঁধার গ্রাম ঘুরে আসা। তরল গলির ডাইল উৎসব দূর থেকে দেখা। হাজার হলেও ভদ্র পরিবারের ছেলে। ওসব কি আর ছুঁয়ে দেখা যায়? নব্বুই দশকে তরল ফেনসিডিলে সয়লাব এ অঞ্চল!

ঢাকা থেকে ফিরে এখনো নিশি ডাকে বের হয়নি। দিন বড় হতে শুরু করেছে। রাতে যদিও শীত জেঁকে বসে। ছুটির দিন ছিলো। মাকসুদ ক্রিকেট প্র্যাকটিস করেছে। ল্যান্টাসে চান্স পাওয়ার কসরত। ল্যান্টাস কুয়েট ক্রিকেট টিম। এক সময় খুলনা প্রথম বিভাগে খেলেছে। বিকেলে বললাম, চল বিল ডাকাতিয়ায় সানসেট দেখি।

দিলীপকে নিয়ে যা। শরীরে ব্যাথা।

ওর থিসিসের কাজ আছে। পার্টনারের সাথে রশীদ হলে বসবে। তুই চল।

হালার থিসিস! ও কি চান্দে যাওনের রকেট বানাইবো?

বানাইলেও তোরে নিবোনা। তুই এখন আমার সাথে তেলিগাতি চল। দ্য গ্রেট বিল ডাকাতিয়া।

বেচারার গায়ে ব্যথাটা টের পেলাম যখন সোয়েটার পরতে হাত উপরে তুললো। চিটাগাইঙ্গা টানে গজ গজ করতে লাগলো। তবু বের হলো আমার সাথে।

লালন শাহ হলে প্রচুর নারকেল গাছ। সামনে পিছনে মিলে প্রায় শ’দুয়েক। পেছন দিকের নারকেল ঝাড় পেরিয়ে পশ্চিমে ইটের ওয়াল। সেটা টপকে টিটিসির মাঠ। মাঠ পেরিয়ে মূল সড়ক। সেখানে এসে ভ্যান নিলাম। পশ্চিমে ছুটছি। ডানে বিল ডাকাতিয়া দেখা যায়। ফাঁকা জায়গা দেখে থামলাম। আরো দূরে যাবার ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু সূর্যের লালবর্ণ বলে দিলো, তাঁর জলডুব দেখতে চাইলে হাতে সময় মাত্র ১০ মিনিট!

ভাড়া মিটিয়ে ক্ষেতের আইলে উত্তরমুখী দৌড়। দুজনের পায়েই বখলেসের স্যান্ডেল সু। হাতে তখন ঘড়ি পড়ি। খুলনা বেতারের ঘোষণা অনুযায়ী আর ৬ মিনিট। হাঁপাতে হাঁপাতে বিলের পাড়ে এসে দাঁড়ালাম। শুকনো মওশুম। বিলে জল কম। কাঁদা বেশি। শক্ত বেলে অংশে একটা বরই গাছ। লাইন অব কলিমেশনে যেনো অবস্টাকল না দাঁড়ায় তাই বরই গাছ পূবে ফেলে পশ্চিমে তাকালাম।

বেশ নিশ্চুপ। প্রচুর পাখি। অথচ শব্দ নেই। আকাশে সারি বেঁধে নীড়ে ফিরছে ওরা। সারাদিন বিলের ছোট্ট কোনো দ্বীপে লাঞ্চ ডিনার সেরেছে। কয়েকটা মাছরাঙা আশে পাশে এখনো ঘুরঘুর করছে। শালিকেরা বিদেয় নিয়েছে আগেই। কেবল কয়েকটি বক আর সারস এক ঠ্যাং পানিতে ডুবিয়ে গলা উঁচিয়ে কী যেনো দেখছে।

যেখানটায় দাঁড়ালাম সেখানে সূর্য ঠিক বিলের মধ্যভাগে। টকটকে লাল সূর্য। বৃত্তাকারে একটু একটু নিচে নামছে। প্রথমে পরিধির তলভাগ সমতল জলে স্পর্শক অংকন করলো। যেনো পরিণত প্রেমিকের ওষ্ঠ খুঁজে পেলো প্রেমিকার চিবুক। আনাড়ি নয়। সৈয়দ শামসুল হকের ম্যাচ্যুইউর্ড নায়কের মতো। চিবুক থেকে অধরে। অধর থেকে গভীরে। আরো গভীরে। ধীরে ধীরে তলিয়ে গেলো অথৈ ভালোবাসার জলে।

ঝাড়া কয়েক সেকেন্ড। আমার পাশে মাকসুদ দাঁড়িয়ে আছে। ভুলে গেছি ওর কথা। চাঁটগাইয়া দইজ্যা পাড়ের ছেলে। জলে সুর্যাস্ত দেখতে আমার চেয়ে অভিজ্ঞ। আকাশে বিরল প্রজাতির প্যাঁচা উড়ছে। নাম না জানা নীলকন্ঠী পাখি দেখলাম আবছায়ায়। কিছুই মনে ধরছেনা। জলের ভেতর সুর্যের অবগাহনের মাতলামিটা মাথা ঝিম ধরিয়ে রেখেছে।

অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ উঠবে দেরী করে। মাকসুদ বললো, ‘চল। ফিরে যাই।’

এতো তাড়াতাড়ি? ১৫ মিনিটও হয় নাই!

কিন্তু অন্ধকার হয়ে আসছে যে।

আরেকটু আগে আসলে রিল্যাক্স কইরা দেখা যাইতো। আয় বরই তলা বসি।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও পা বাড়ালো।

এর আগেও বিল ডাকাতিয়ায় সুর্যডোবা দেখেছি। কিন্তু এই লোকেশনে আসিনি। এটাই কুয়েটে শেষ বছর। ফোর্থ ইয়ার। আগের বছরগুলো বেশি কঠিন মনে হতো। এখন মনেহয় উৎড়ানো যাবে। আর না গেলেই কী! ফেইলর ইজ দ্য পিলার অব সাকসেস।

বরইতলা ঘাস দেখে বসলাম। আবছায়া অন্ধকারে মাথা নীচু করে ঘাস খুঁজতে হয়। মাকসুদ, তোর ঐডার খবর কি রে?

কোনডা?

কোনডা মানে? কয়জনের লগে টাংকি মারছ? ঐ যে ইংরেজি না অর্থনীতিতে পড়ে?

ধূর ব্যাটা। কথাই হইলো না। কি খবর দেবো যে। তোরটার কি অবস্থা?

কোনো অবস্থা নাই দোস্তো। বুকে অনেক প্রেম।

তোর আমার দুজনেরই। কিন্তু কপালে জোটেনা।

হঠাৎ ঢিল ছোঁড়ার শব্দ পেলাম। পানিতে ঢুপ আওয়াজ। আশে পাশে কাউকে দেখছি না। সবচে কাছের বাড়িটাও প্রায় দেড়শো গজ দূরে। আবার ঢুপ। আবারো! এবার একটু ভয় পেলাম। দাঁড়িয়ে গেলাম দুইজনেই। মরার উপর খাঁড়ার ঘা। খাঁড়া অবস্থায় মাঝারি সাইজের মাটির ঢিলা পড়লো আমার পাশে। অথচ কোথাও কেউ নেই!!

অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো টেকো মাথা বুড়ো। চান্দি চকচক করলেও চতুর্দিকে সজারুর কাঁটার মতো মতো উসকো খুসকো চুল। মুখে মাঝারি সাইজের জট পাকানো দাঁড়ি। চোখ দুটো উদ্ভ্রান্ত। বয়সের তুলনায় শরীরের গড়ন বেশ শক্ত। আমরা হাফ সোয়াটারে শীত বোধ করলেও বুড়ো গেঞ্জি গায়ে দাঁড়িয়ে। আস্তিন ওয়ালা সাদা গেঞ্জি। বগলের কাছে ছেঁড়া। হাতে বিরাট সাইজের পাথর। এ তল্লাটে এমন পাথর থাকার কথা না।

পাথর হাতে হাঁপাতে লাগলো বুড়ো। “তোরা কী করতিছিস”

খুলনার টানে বললাম, বেড়াতি আইছি।

কোনে থাহিস?

বুড়োর তুই তুকারি ভালো লাগছিলোনা। ডাট দেখিয়ে বললাম, এখানে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি।

বাড়িত যা। তোমাইগে লাইগা আমার মা আইসপার পারতিছেনা।

মানে? এই অন্ধকারে আপনের মা এইখানে কি করবেন?

রেগে গেলো বুড়ো। তাতে তোমাগো কি? কইতেছি বাড়িত যা।

বুড়োর পাথরটা বেশ ভারী। হাত ছেঁচড়ে নিচে নামতে চাইছে। আবার টেনে তোলে। ঘষা খেয়ে কয়েক জায়গায় ছড়ে গেছে। রক্তের ছোপছোপ দাগ। মাকসুদ অপলক চেয়ে আছে পাথরটার দিকে। উইকেট কীপারের ভঙ্গিতে। যেনো ছুঁড়ে মারলেই ও ধরে ফেলবে।

বুড়ো ঝাঁঝের সাথে বললো, তোরা যাবিনে?

দুহাত সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যানের মতো উপরে তুলছে। একটু একটু করে উঁচু হচ্ছে পাথর। বুক পর্যন্ত চলে এলো। হাতের তালুতে ধরার জায়গা বদল করলো। আবার তুললো। এবার কাঁধ বরাবর। আরো উপরে উঠছে। আরো। পুরো দুহাত উর্ধ্বে ওঠানো। রক্তাক্ত দুহাতে শক্ত করে ধরা পাথর। ঠিক মাকসুদের মাথা বরাবর।

 

ব্রাম্পটন, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent